শরিকি জমির অংশ বাইরের কারও কাছে বিক্রি হলে উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক আদালতের মাধ্যমে সেই জমি কিনে নিতে পারেন। এর নাম অগ্রক্রয় মামলা। তবে সময়সীমা খুব কঠোর, আর আবেদনের সাথেই পুরো টাকা জমা দিতে হয়। এই লেখায় শর্ত, সময়সীমা, জমার হিসাব ও আদালতের প্রক্রিয়া সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।

- কৃষি জমির ক্ষেত্রে অগ্রক্রয়ের অধিকার আসে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা থেকে; ২০০৬ সালের সংশোধনের পর কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিকই এই আবেদন করতে পারেন।
- বিক্রির নোটিশ পাওয়ার, অথবা নোটিশ না পেলে বিক্রির কথা জানার, দুই মাসের মধ্যে আবেদন করতে হয়; দলিল রেজিস্ট্রির তিন বছর পর আর কোনো আবেদন চলে না।
- আবেদনের সাথেই পণের টাকা, তার ২৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ এবং দলিলের তারিখ থেকে বার্ষিক ৮ শতাংশ সরল সুদ আদালতে জমা দিতে হয়।
- টাকা কম জমা দিলে বা দেরিতে দিলে উচ্চ আদালত একাধিক রায়ে মামলা খারিজ করেছে।
- অকৃষি জমির জন্য আলাদা বিধান আছে অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৪৯-এর ২৪ ধারায়।
অগ্রক্রয় কী এবং কেন
অগ্রক্রয় (pre-emption) মানে আগে কেনার অধিকার। বাংলাদেশে একই জোত বা হোল্ডিংয়ে একাধিক শরিক থাকা খুব সাধারণ, বিশেষ করে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর ভাই-বোনেরা যখন উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক হন। এমন অবস্থায় একজন শরিক যদি তার অংশ বাইরের কোনো লোকের কাছে বিক্রি করে দেন, তাহলে বাকি শরিকেরা একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিজেদের জমির ভেতরে অংশীদার হিসেবে পান।
আইন এই সমস্যার সমাধান দিয়েছে অগ্রক্রয়ের অধিকারের মাধ্যমে। উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক আদালতে আবেদন করে ক্রেতার দেওয়া দাম এবং আইনে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ জমা দিয়ে সেই জমি নিজের নামে নিতে পারেন। এই আবেদনকেই সাধারণভাবে অগ্রক্রয় মামলা বলা হয়। আদালতে এটি সাধারণত বিবিধ মামলা (মিস কেস) হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
অগ্রক্রয়ের অধিকার কোথা থেকে আসে
বাংলাদেশে অগ্রক্রয়ের তিনটি উৎস আছে। কৃষি জমির জন্য রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা, অকৃষি জমির জন্য অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৪৯-এর ২৪ ধারা, এবং মুসলিম আইনের শুফা। বাস্তবে অধিকাংশ অগ্রক্রয় মামলা ৯৬ ধারার অধীনে হয়, তাই এই লেখার বেশির ভাগ অংশ সেই ধারা নিয়ে।
কে অগ্রক্রয় মামলা করতে পারেন
২০০৬ সালের সংশোধনের আগে সহ-শরিকের পাশাপাশি পাশের জমির মালিকও অগ্রক্রয়ের দাবি করতে পারতেন। সংশোধনের পর এই সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। এখন ৯৬ ধারায় আবেদন করতে পারেন কেবল সেই হোল্ডিংয়ের সহ-শরিক প্রজা, যিনি উত্তরাধিকারসূত্রে শরিক হয়েছেন এবং আইনের ৯০ ধারা অনুযায়ী জমি কেনার যোগ্য।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায়ে (সিভিল রিভিশন নং ৪৫১৭/২০২৩) এই শর্তগুলো উদ্ধৃত করা হয়েছে। একই বছরের ডিসেম্বরে আরেকটি রায়ে (সিভিল রিভিশন নং ২৭০৫/২০২২) আদালত জোর দিয়েছেন যে সংশ্লিষ্ট খতিয়ানে আবেদনকারী বা তার পূর্বসূরির নাম রেকর্ডভুক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। আবেদনকারী যদি আগেই নিজের পুরো অংশ বিক্রি করে দিয়ে থাকেন, তাহলে তার আর কোনো অধিকার থাকে না।
কারা আবেদন করতে পারেন না
- ক্রয়সূত্রে শরিক। যিনি দলিলমূলে কিনে শরিক হয়েছেন, উত্তরাধিকারসূত্রে নন, তিনি সংশোধিত ৯৬ ধারায় আবেদন করতে পারেন না।
- পাশের জমির মালিক। শুধু পাশের জমির মালিক হওয়া এখন আর যথেষ্ট নয়।
- ক্রেতা নিজে শরিক হলে। বিক্রি যদি অন্য এক সহ-শরিকের কাছে হয়, তাহলে ৯৬ ধারার অগ্রক্রয় প্রযোজ্য নয়।
- নিজের অংশ বিক্রি করে ফেলা শরিক। বিক্রির সময় যার আর কোনো অংশ অবশিষ্ট নেই।
একাধিক সহ-শরিক থাকলে
একই হোল্ডিংয়ে কয়েকজন উত্তরাধিকারসূত্রে শরিক থাকলে যে কেউ অগ্রক্রয় মামলা করতে পারেন। অন্য যোগ্য শরিকেরাও আইনের বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন, এবং সে ক্ষেত্রে জমার টাকার দায়ও ভাগ হয়। পরিবারের মধ্যে আগে থেকেই আলোচনা করে একসাথে আবেদন করলে পরে শরিকদের নিজেদের মধ্যে নতুন বিরোধ এড়ানো যায়।

কোন হস্তান্তরে অগ্রক্রয় চলে
অগ্রক্রয়ের অধিকার জন্মায় শুধু বিক্রয়ের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে জমির অংশ বাইরের কারও কাছে হস্তান্তর হলে। হেবা বা দান, ওয়াকফ, উত্তরাধিকার বা বণ্টননামার মাধ্যমে জমি গেলে সাধারণত অগ্রক্রয় মামলা চলে না, কারণ সেখানে কোনো পণ নেই।
তবে বাস্তবে অনেক সময় বিক্রিকে হেবা বা অন্য দলিল হিসেবে দেখানো হয়, যাতে শরিকেরা অগ্রক্রয়ের দাবি করতে না পারেন। আবেদনকারী যদি প্রমাণ করতে পারেন যে দলিলটি আসলে টাকার বিনিময়ে বিক্রয়, তাহলে আদালত প্রকৃত লেনদেনই বিবেচনা করেন। এ ধরনের মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখ্য, রেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) আইন ২০২৬ হেবা দলিলের ক্ষেত্রেও রেজিস্ট্রেশন আইনের ৫২ক ধারার খতিয়ান-সংক্রান্ত শর্ত প্রসারিত করেছে বলে জানা গেছে। চূড়ান্ত আইনের পাঠ মিলিয়ে নেওয়া উচিত, কারণ এতে সাজানো হেবা দলিলের ঝুঁকিও কিছুটা কমতে পারে।
বিক্রি হয়েছে কি না নিশ্চিত হতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের সার্টিফায়েড কপি তুলুন। দলিলে লেখা পণের অঙ্ক থেকেই জমার হিসাব শুরু হয়, তাই অনুমানের ওপর মামলা করবেন না।
অগ্রক্রয় মামলার সময়সীমা
অগ্রক্রয় মামলায় সময়সীমাই সবচেয়ে বড় ফাঁদ। ৯৬ ধারা অনুযায়ী বিক্রির পর রেজিস্ট্রেশন কর্মকর্তা ৮৯ ধারায় সহ-শরিকদের নোটিশ পাঠান। এই নোটিশ জারির তারিখ থেকে দুই মাসের মধ্যে আবেদন করতে হয়। নোটিশ জারি না হলে বিক্রির কথা জানার তারিখ থেকে দুই মাস সময় পাওয়া যায়।
এর ওপর আছে একটি চূড়ান্ত সীমা: দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে তিন বছর পার হলে আর কোনো আবেদন চলে না, নোটিশ পাওয়া যাক বা না যাক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের রায়ে হাইকোর্ট বিভাগ এই তিন বছরের সীমাকে বাধ্যতামূলক ও চূড়ান্ত বলে বর্ণনা করেছেন।
| পরিস্থিতি | সময় গণনা শুরু | সময়সীমা |
|---|---|---|
| ৮৯ ধারার নোটিশ জারি হয়েছে | নোটিশ জারির তারিখ | দুই মাস |
| নোটিশ জারি হয়নি | বিক্রির কথা জানার তারিখ | দুই মাস |
| যেকোনো অবস্থায় | দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ | তিন বছর পর আর আবেদন নয় |
| অকৃষি জমি (২৪ ধারা) | নোটিশ জারি বা জানার তারিখ | চার মাস |
৮৯ ধারার নোটিশ কেন গুরুত্বপূর্ণ
শরিকি জোতের অংশ বিক্রির দলিল রেজিস্ট্রির সময় আইনে সহ-শরিকদের কাছে নোটিশ পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে তারা বিক্রির কথা জানতে পারেন। নোটিশ ঠিকমতো জারি হলে দুই মাসের হিসাব সেই তারিখ থেকেই শুরু হয়, আবেদনকারী পরে না জানার দাবি করতে পারেন না। আবার নোটিশ জারি না হলে বা ভুল ঠিকানায় গেলে জানার তারিখই নির্ধারক হয়ে ওঠে।
তাই অগ্রক্রয় মামলা করার আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড দেখে নিন নোটিশ কবে, কার নামে এবং কোন ঠিকানায় পাঠানো হয়েছিল। ক্রেতার পক্ষেও নোটিশ জারির প্রমাণ সংরক্ষণ করা দরকার, কারণ এটিই তামাদির আপত্তির সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।
জানার তারিখ প্রমাণ করা
নোটিশ না পেলে আবেদনকারীকে দেখাতে হয় তিনি কবে বিক্রির কথা জেনেছেন। আদালত এই দাবি সহজে মেনে নেন না। যিনি খবর দিয়েছেন তাকে সাক্ষী হিসেবে হাজির না করায় একটি মামলায় আদালত জানার তারিখের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাই কবে, কীভাবে, কার কাছ থেকে জেনেছেন তার স্পষ্ট বিবরণ ও সাক্ষী প্রস্তুত রাখুন।
অগ্রক্রয় মামলায় টাকা জমার হিসাব
অগ্রক্রয় মামলা দায়েরের সময় আবেদনকারীকে তিনটি অঙ্ক একসাথে আদালতে জমা দিতে হয়। ৯৬ ধারার বর্তমান পাঠ অনুযায়ী এগুলো হলো:
- পণের টাকা। ৮৯ ধারার নোটিশে বা বিক্রয় দলিলে যে মূল্য দেখানো হয়েছে।
- ক্ষতিপূরণ। সেই পণের ২৫ শতাংশ, যা ক্রেতাকে দেওয়া হয়।
- সুদ। দলিল সম্পাদনের তারিখ থেকে আবেদন দাখিলের তারিখ পর্যন্ত পণের ওপর বার্ষিক ৮ শতাংশ সরল সুদ।
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন দলিলে পণ ১০ লাখ টাকা এবং দলিলের এক বছর পর আবেদন করা হচ্ছে। তাহলে জমা দিতে হবে পণ ১০ লাখ, ক্ষতিপূরণ আড়াই লাখ এবং সুদ ৮০ হাজার, মোট ১৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সময় যত বাড়বে, সুদের অঙ্কও তত বাড়বে।
২০০৬ সালের সংশোধনের আগে ক্ষতিপূরণের হার ছিল ১০ শতাংশ, তাই পুরোনো রায় পড়ার সময় কোন পাঠ প্রযোজ্য তা খেয়াল রাখুন। পুরোনো বিক্রির ক্ষেত্রে কোন হার প্রযোজ্য হবে, সেটি আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে নিশ্চিত হোন।
দলিলে কম দাম দেখানো হলে
বাস্তবে অনেক বিক্রয় দলিলে স্ট্যাম্প শুল্ক ও রেজিস্ট্রেশন খরচ বাঁচাতে প্রকৃত দামের চেয়ে কম পণ দেখানো হয়। অগ্রক্রয়ের জমার হিসাব সাধারণত দলিলে বা ৮৯ ধারার নোটিশে লেখা পণ থেকেই হয়। ফলে দলিলে কম দাম দেখানো ক্রেতার জন্য পরে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, কারণ তিনি প্রকৃত দাম ফেরত না-ও পেতে পারেন।
ক্রেতা বেশি দাম দেওয়ার দাবি তুললে আদালত তা কতটা বিবেচনা করবেন, সেটি ধারার বর্তমান পাঠ ও উচ্চ আদালতের নজিরের ওপর নির্ভর করে। নিরাপদ পথ হলো দলিলে প্রকৃত মূল্য লেখা। আবেদনকারীর দিক থেকেও দলিলের অঙ্ক থেকে হিসাব করাই নিয়ম; নিজের অনুমানে কম টাকা জমা দেবেন না।
কম বা দেরিতে জমার পরিণতি
জমার শর্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ের রায়ে দেখা যায়, আবেদনকারীরা দায়েরের সময় শুধু পণের অংশ জমা দিয়ে প্রায় দশ মাস পরে আদালতের অনুমতি ছাড়াই বাকি টাকা জমা দিয়েছিলেন। হাইকোর্ট বিভাগ আপিল বিভাগের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এই ঘাটতিকে মারাত্মক ত্রুটি ধরে আবেদন খারিজ করেছেন। তাই হিসাব একবার নয়, দুবার যাচাই করুন।
অগ্রক্রয় মামলা দায়েরের ধাপ
সঠিক প্রস্তুতি থাকলে অগ্রক্রয় মামলা দায়ের জটিল নয়। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করলে সাধারণ ভুলগুলো এড়ানো যায়।
- কাগজপত্র সংগ্রহ। বিক্রয় দলিলের সার্টিফায়েড কপি, সর্বশেষ খতিয়ান (সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস), ওয়ারিশ সনদ এবং ৮৯ ধারার নোটিশ (যদি পেয়ে থাকেন) জোগাড় করুন। খতিয়ানের কপি ই-পর্চা থেকেও তোলা যায়।
- যোগ্যতা যাচাই। আপনি উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক কি না, বিক্রির সময় আপনার অংশ ছিল কি না এবং ক্রেতা শরিক নন কি না নিশ্চিত হোন।
- সময় গণনা। নোটিশের তারিখ বা জানার তারিখ থেকে দুই মাস এবং রেজিস্ট্রি থেকে তিন বছর এখনো পার হয়নি তা দেখুন।
- টাকার হিসাব। পণ, ২৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ ও ৮ শতাংশ সুদের হিসাব লিখিতভাবে করুন এবং টাকা প্রস্তুত রাখুন।
- আবেদন দাখিল। জমি যে এলাকায়, সেই এলাকার এখতিয়ারসম্পন্ন দেওয়ানি আদালতে আবেদন করুন এবং একই সময়ে পুরো টাকা ট্রেজারি চালান বা আদালতের নির্দেশিত পদ্ধতিতে জমা দিন।
- পক্ষভুক্ত করা। ক্রেতাকে প্রধান প্রতিপক্ষ এবং বিক্রেতা ও অন্য সহ-শরিকদের প্রয়োজনমতো পক্ষ করুন, যাতে সবাই নোটিশ পান।
- শুনানি ও সাক্ষ্য। ক্রেতার আপত্তির জবাব দিন, খতিয়ান ও ওয়ারিশ সূত্র প্রমাণ করুন এবং জানার তারিখের সাক্ষী হাজির করুন।
কোন আদালতে আবেদন করবেন
অগ্রক্রয় মামলা জেলা পর্যায়ের দেওয়ানি আদালতে হয়। মামলার মূল্যমান অনুযায়ী সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ বা যুগ্ম জেলা জজের আদালতে এখতিয়ার নির্ধারিত হয়। আর্থিক এখতিয়ারের সীমা দেওয়ানি আদালত আইনে সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে, তাই দায়েরের আগে বর্তমান সীমা মিলিয়ে নিন। দেওয়ানি মামলার ধরন সম্পর্কে আরও জানতে আমাদের দেওয়ানি মামলার প্রকারভেদ গাইডটি দেখতে পারেন।
ক্রেতা কীভাবে আত্মরক্ষা করেন
যিনি জমি কিনেছেন, তার কাছে অগ্রক্রয় মামলা একটি বড় অনিশ্চয়তা। আইন তাকেও কিছু আত্মরক্ষার সুযোগ দিয়েছে। ক্রেতার পক্ষে সাধারণ আপত্তিগুলো হলো:
- আবেদনকারী উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক নন, অথবা খতিয়ানে তার বা তার পূর্বসূরির নাম নেই।
- দুই মাস বা তিন বছরের সময়সীমা পার হয়ে গেছে।
- দায়েরের সময় পুরো টাকা জমা দেওয়া হয়নি।
- ক্রেতা নিজেই সেই হোল্ডিংয়ের সহ-শরিক।
- হস্তান্তরটি বিক্রয় নয়, প্রকৃত হেবা বা অন্য ধরনের হস্তান্তর।
- বিক্রির আগে আবেদনকারীকে জমি কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি লিখিতভাবে অস্বীকার করেছিলেন।
শেষ আপত্তিটির ওজন প্রতিটি মামলার তথ্যের ওপর নির্ভর করে, তবে লিখিত প্রস্তাব ও প্রত্যাখ্যানের প্রমাণ থাকলে ক্রেতার অবস্থান অনেক শক্ত হয়।
শরিকি জমি কেনার আগে বাকি শরিকদের লিখিতভাবে জানান এবং সম্ভব হলে তাদের অনাপত্তি নিন। দলিল রেজিস্ট্রির পর তিন বছর পর্যন্ত অগ্রক্রয় মামলার ঝুঁকি থাকে, তাই এই সময়ের মধ্যে বড় নির্মাণ বা উন্নয়নের আগে ভেবে দেখুন। জমি কেনার সাধারণ সতর্কতা জানতে আমাদের জমি রেজিস্ট্রেশন গাইড দেখুন।

আদেশের পর করণীয় ও আপিল
আদালত অগ্রক্রয় মামলা মঞ্জুর করলে আবেদনকারী ক্রেতার জায়গায় জমির মালিক হন এবং জমা দেওয়া টাকা ক্রেতা আদালত থেকে তুলে নিতে পারেন। এরপর আদালতের আদেশের সার্টিফায়েড কপি দিয়ে দখল নিতে হয় এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নামজারির আবেদন করতে হয়। নামজারি অনলাইনে ভূমিসেবা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে করা যায়।
আবেদন খারিজ হলে আবেদনকারী সাধারণত জমা দেওয়া টাকা ফেরত নিতে পারেন। আদেশে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে জেলা জজ আদালতে বিবিধ আপিল করা যায়, এবং আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর ১১৫ ধারায় হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন করা যায়। আপিল ও রিভিশনের নিজস্ব তামাদি মেয়াদ আছে, তাই আদেশ পাওয়ার পরপরই সিদ্ধান্ত নিন।
নিষ্পত্তিতে কত সময় লাগে
অগ্রক্রয় মামলার নির্দিষ্ট কোনো সরকারি সময়সীমা নেই। সাক্ষ্যগ্রহণ, প্রতিপক্ষের সময় প্রার্থনা এবং আপিল-রিভিশন মিলিয়ে অনেক মামলা কয়েক বছর চলে। এই সময়ে জমা দেওয়া টাকা আদালতে আটকে থাকে, তাই আর্থিক পরিকল্পনা আগে থেকেই করুন।
আপস, মধ্যস্থতা ও আইনগত সহায়তা
প্রতিটি বিরোধ আদালতের রায় পর্যন্ত গড়ানোর দরকার নেই। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা বুঝতে পারেন যে শরিকদের সঙ্গে লড়াই করে জমি রাখা কঠিন, আর শরিকেরাও দীর্ঘ মামলার খরচ এড়াতে চান। তখন ক্রেতা স্বেচ্ছায় নতুন রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে শরিকের কাছে জমি বিক্রি করে দিতে পারেন। এতে নতুন স্ট্যাম্প ও রেজিস্ট্রেশন খরচ লাগে, কিন্তু সময় ও অনিশ্চয়তা অনেক কমে।
মনে রাখবেন, আলোচনা চলাকালে সময়সীমা থেমে থাকে না। আপসের সম্ভাবনা থাকলেও দুই মাসের মধ্যে আবেদন ও টাকা জমা দিয়ে নিজের অধিকার সুরক্ষিত রাখুন, তারপর আদালতের অনুমতি নিয়ে আপস করুন। দেওয়ানি আদালতে মধ্যস্থতার সুযোগও আছে, যেখানে প্রশিক্ষিত মধ্যস্থতাকারীর সাহায্যে দুই পক্ষ সমাধানে পৌঁছাতে পারেন।
আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিরা জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে অগ্রক্রয়ে পণ ও ক্ষতিপূরণের টাকা আবেদনকারীকেই জোগাড় করতে হয়; লিগ্যাল এইড সেই টাকা দেয় না।
প্রবাসী শরিকের জন্য
অনেক শরিক বিদেশে থাকেন এবং বিক্রির খবর দেরিতে পান। প্রবাসী শরিক দেশে কাউকে আমমোক্তার নিয়োগ করে অগ্রক্রয় মামলা পরিচালনা করতে পারেন। বিদেশে সম্পাদিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২ ও বিধিমালা অনুযায়ী দেশে আসার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রত্যয়ন করাতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় সময় লাগে, অথচ দুই মাসের সময়সীমা চলতেই থাকে। তাই খবর পাওয়ামাত্র আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। বিস্তারিত জানতে আমাদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি গাইড দেখুন।
অকৃষি জমি ও মুসলিম আইনের শুফা
শহরের বাড়ি, দোকান বা অকৃষি কাজে ব্যবহৃত জমির শরিকি অংশ বিক্রি হলে প্রযোজ্য হয় অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৪৯-এর ২৪ ধারা। এখানে সহ-শরিক প্রজা নোটিশ জারি বা জানার তারিখ থেকে চার মাসের মধ্যে আবেদন করতে পারেন। ২০২৪ সালের মে মাসের একটি হাইকোর্ট রায়ে বলা হয়েছে, কোনো দাগে জমির অংশ থাকলে সেই সহ-শরিক পুরো দাগেরই শরিক হিসেবে গণ্য হতে পারেন, এমনকি দাগটি একাধিক খতিয়ানে থাকলেও।
২৪ ধারার মামলাতেও পণের সাথে আইনে নির্ধারিত হারে ক্ষতিপূরণ জমা দিতে হয়। এই হার ৯৬ ধারার হারের সমান নয়, তাই দায়েরের আগে বর্তমান পাঠ মিলিয়ে হিসাব করুন। জমিটি কৃষি না অকৃষি, সেটিই প্রথম প্রশ্ন, কারণ ভুল ধারায় আবেদন করলে পুরো মামলা ঝুঁকিতে পড়ে।
মুসলিম আইনের শুফা
মুসলিম আইনেও শুফা বা অগ্রক্রয়ের ধারণা আছে, যেখানে দাবিদারকে বিক্রির কথা জানামাত্র নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক দাবি জানাতে হয়। বর্তমানে কৃষি ও অকৃষি জমির জন্য বিধিবদ্ধ আইন থাকায় শুফার ভিত্তিতে মামলা খুবই কম হয় এবং এর প্রয়োগক্ষেত্র নিয়ে মতভেদ আছে। এই পথে যাওয়ার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিন।
যেসব ভুলে আবেদন ব্যর্থ হয়
আমাদের অভিজ্ঞতায় যেসব কারণে সবচেয়ে বেশি অগ্রক্রয় মামলা ব্যর্থ হয়, সেগুলো হলো:
- দেরি। জানার পর আলোচনায় সময় নষ্ট করে দুই মাস পার করে ফেলা।
- ভুল হিসাব। সুদ বা ক্ষতিপূরণ কম ধরা, অথবা পুরোনো ১০ শতাংশ হার ব্যবহার করা।
- ওয়ারিশ সূত্র প্রমাণ না করা। ওয়ারিশ সনদ, খতিয়ান ও বংশতালিকা দিয়ে উত্তরাধিকার স্পষ্টভাবে দেখাতে না পারা। ওয়ারিশ সনদ সম্পর্কে জানতে আমাদের উত্তরাধিকার সনদ গাইড দেখুন।
- ভুল আইন। অকৃষি জমির জন্য ৯৬ ধারায় বা কৃষি জমির জন্য ২৪ ধারায় আবেদন করা।
- সব পক্ষকে যুক্ত না করা। ক্রেতা বা প্রয়োজনীয় শরিককে বাদ দিয়ে আবেদন করা।
এর প্রতিটি ভুলই প্রস্তুতির পর্যায়ে ধরা সম্ভব। আবেদন দাখিলের পর ভুল সংশোধনের সুযোগ সীমিত, তাই শুরুতেই কাগজপত্র ও হিসাব যাচাই করুন।
অগ্রক্রয় মামলা নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
ভাই যদি তার অংশ বাইরের লোকের কাছে বিক্রি করেন, আমি কি জমি ফেরত নিতে পারব?
আপনি যদি উত্তরাধিকারসূত্রে সেই হোল্ডিংয়ের সহ-শরিক হন এবং সময়সীমার মধ্যে পুরো টাকা জমা দিয়ে আবেদন করেন, তাহলে আদালতের মাধ্যমে জমিটি নিজের নামে নিতে পারেন।
পাশের জমির মালিক কি অগ্রক্রয় মামলা করতে পারেন?
২০০৬ সালের সংশোধনের পর কৃষি জমির ক্ষেত্রে শুধু পাশের জমির মালিক হিসেবে আর ৯৬ ধারায় আবেদন করা যায় না। উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক হতে হয়।
নোটিশ পাইনি, তিন বছর পর জানলাম। এখন কি মামলা করা যাবে?
সাধারণত না। দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে তিন বছর পার হলে ৯৬ ধারায় আর আবেদন চলে না, এবং উচ্চ আদালত এই সীমাকে চূড়ান্ত বলেছেন।
টাকা কিস্তিতে জমা দেওয়া যায় কি?
না। আবেদনের সাথেই পণ, ২৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ ও ৮ শতাংশ সুদ জমা দিতে হয়। পরে জমা দিলে মামলা খারিজের ঝুঁকি থাকে।
হেবা দলিলের বিরুদ্ধে অগ্রক্রয় মামলা চলে কি?
প্রকৃত হেবার বিরুদ্ধে চলে না। তবে প্রমাণ করা গেলে যে হেবা আসলে টাকার বিনিময়ে বিক্রয়, তাহলে আদালত সেটিকে বিক্রয় হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।
মামলা জিতলে নামজারি কীভাবে করব?
আদালতের আদেশের সার্টিফায়েড কপি দিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে বা অনলাইনে ভূমিসেবা প্ল্যাটফর্মে নামজারির আবেদন করুন।
আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি
আমরা সহ-শরিক ও ক্রেতা উভয় পক্ষের হয়ে অগ্রক্রয় মামলায় কাজ করি: যোগ্যতা ও সময়সীমা যাচাই, জমার সঠিক হিসাব, আবেদন দাখিল, সাক্ষ্য পরিচালনা এবং আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন পর্যন্ত। জমি কেনার আগে ঝুঁকি যাচাইয়েও আমরা পরামর্শ দিই। আমাদের রিয়েল এস্টেট ও ভূমি আইন সেবা সম্পর্কে জানুন।
শরিকি জমি বিক্রি নিয়ে সমস্যায় আছেন?
সময় চলে যাওয়ার আগে আপনার কাগজপত্র দেখিয়ে নিন। আমরা অধিকার, সময়সীমা ও জমার হিসাব পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেব।
পরামর্শ বুক করুনরিয়েল এস্টেট আইনপ্রাথমিক উৎস: রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ ও অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৪৯, বাংলাদেশের আইন পোর্টাল; হাইকোর্ট বিভাগের রায় (সিভিল রিভিশন ৪৫১৭/২০২৩, ১৬ জুলাই ২০২৫; ২৭০৫/২০২২, ২ ডিসেম্বর ২০২৫; ১৫০৪/২০২১, ১৪ মে ২০২৪), বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; খতিয়ান ও নামজারি সেবা, ভূমি মন্ত্রণালয়।
এই লেখাটি ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের আইন সম্পর্কে সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। আইনের পাঠ, আদালতের এখতিয়ার ও প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হতে পারে; কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে আপনার নির্দিষ্ট বিষয়টি আলোচনা করুন।



0 Comments