স্বামী সংসারের খরচ না দিলে, তালাকের পর ইদ্দতকালের খরচ না দিলে বা সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার টাকা বন্ধ করে দিলে ভরণপোষণ মামলা করে সেই অধিকার আদায় করা যায়। মুসলিম আইন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এবং পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ স্ত্রী ও সন্তানদের এই সুরক্ষা দিয়েছে। এই গাইডে সহজ ভাষায় দেখানো হলো কে কতদিন ভরণপোষণ পান, কোথায় ও কীভাবে মামলা করবেন এবং রায়ের পর টাকা কীভাবে আদায় করবেন।

- বিয়ে চলাকালীন স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়া স্বামীর আইনগত দায়িত্ব; স্ত্রী বাবার বাড়িতে থাকলেও যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে এই অধিকার থাকে।
- তালাকের পর স্ত্রী ইদ্দতকাল পর্যন্ত ভরণপোষণ পান; ইদ্দতের পর স্থায়ী ভরণপোষণ সাধারণত পান না।
- সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবার, সন্তান যার হেফাজতেই থাকুক।
- ভরণপোষণ মামলা পারিবারিক আদালতে করতে হয়, এবং চাইলে দেনমোহরের দাবি একই মামলায় যুক্ত করা যায়।
- বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণের জন্য আলাদা আইন আছে: পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩।
ভরণপোষণ কী এবং কী কী অন্তর্ভুক্ত
ভরণপোষণ বলতে শুধু খাবার খরচ বোঝায় না। আইনের দৃষ্টিতে এর মধ্যে আছে খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, চিকিৎসা, এবং সন্তানের ক্ষেত্রে পড়াশোনার খরচ। পরিমাণ নির্ধারণে আদালত স্বামী বা বাবার আয়, সামাজিক অবস্থান, পরিবারের জীবনযাত্রার মান এবং যিনি ভরণপোষণ চাইছেন তার প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনা করেন। তাই একটি ভরণপোষণ মামলা শুরু করার আগে মাসিক খরচের বাস্তব হিসাব তৈরি করা জরুরি।
মুসলিম আইনে স্ত্রী ধনী হলেও স্বামী তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। এটি বিয়ের চুক্তি থেকে উদ্ভূত অধিকার, দয়া নয়। একইভাবে নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ বাবার দায়িত্ব, মায়ের নিজের আয় থাকলেও।
স্ত্রীর ভরণপোষণের অধিকার
বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী। স্বামী যদি স্ত্রীকে ভরণপোষণ না দেন, অবহেলা করেন বা বাড়ি থেকে বের করে দেন, স্ত্রী ভরণপোষণ মামলা করতে পারেন। স্ত্রী যদি নির্যাতন, দ্বিতীয় বিয়ে, দেনমোহর না দেওয়া বা অন্য যুক্তিসঙ্গত কারণে আলাদা থাকেন, তাহলেও সাধারণত তার ভরণপোষণের অধিকার নষ্ট হয় না।
তবে কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে থাকতে অস্বীকার করলে আদালত ভরণপোষণের দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। এজন্য আলাদা থাকার কারণ ও তার প্রমাণ মামলায় খুব গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৯ ধারা
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ৯ ধারা অনুযায়ী স্বামী পর্যাপ্তভাবে ভরণপোষণ না দিলে, অথবা একাধিক স্ত্রী থাকলে তাদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত আচরণ না করলে, স্ত্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কাছে আবেদন করতে পারেন। চেয়ারম্যান সালিশি পরিষদ গঠন করে ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণের সার্টিফিকেট দিতে পারেন। বাস্তবে অধিকাংশ নারী সরাসরি পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণ মামলা করেন, কারণ আদালতের ডিক্রি জারি করা সহজ। মুসলিম পারিবারিক আইন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ বিষয়ক লেখা দেখুন।

তালাকের পর ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ
তালাক কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রী ইদ্দতকাল পর্যন্ত ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী। সাধারণত ইদ্দতকাল তিন মাস (তিন ঋতুচক্র); স্ত্রী গর্ভবতী হলে সন্তান জন্ম পর্যন্ত। হেফজুর রহমান বনাম শামসুন নাহার বেগম মামলায় (৫১ ডিএলআর (এডি) ১৭২, ১৯৯৯) আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত দেন যে মুসলিম আইনে ইদ্দতকাল শেষ হওয়ার পর সাবেক স্ত্রী স্থায়ী ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী নন। তাই তালাকের পর ভরণপোষণ মামলা করলে সাধারণত ইদ্দতকালের খরচ, অপরিশোধিত দেনমোহর এবং সন্তানের ভরণপোষণ দাবি করা হয়।
তালাকের নোটিশ কবে পাঠানো ও চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে কবে পৌঁছেছে, সেই তারিখগুলো সংরক্ষণ করুন। তালাক কবে কার্যকর হয়েছে তার ওপর ইদ্দতকাল ও ভরণপোষণের হিসাব নির্ভর করে।
সন্তানের ভরণপোষণ
মুসলিম আইনে সন্তানের ভরণপোষণ বাবার দায়িত্ব। ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত এবং মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে বিয়ে পর্যন্ত এই দায়িত্ব থাকে। সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও বাবাকে ভরণপোষণ দিতে হয়। প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলেও নিজেকে চালাতে না পারলে বাবার দায়িত্ব অব্যাহত থাকতে পারে।
মা সন্তানের পক্ষে ভরণপোষণ মামলা করতে পারেন। আদালত সন্তানের বয়স, পড়াশোনা, চিকিৎসা ও বাবার আয় বিবেচনা করে মাসিক অর্থ নির্ধারণ করেন, এবং প্রয়োজনে প্রতি বছর নির্দিষ্ট হারে বৃদ্ধির আদেশও দিতে পারেন। সন্তানের হেফাজত নিয়ে জানতে আমাদের অভিভাবকত্ব বিষয়ক লেখা দেখুন।
কোথায় ও কীভাবে ভরণপোষণ মামলা করবেন
পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ অনুযায়ী পারিবারিক আদালত বিয়ে বিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং অভিভাবকত্ব ও হেফাজতের মামলার বিচার করে। সাধারণত স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করেন, সেই এলাকার পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণ মামলা করা যায়, যা নারীদের জন্য বড় সুবিধা। কোর্ট ফি নির্ধারিত এবং তুলনামূলকভাবে কম।
- হিসাব ও প্রমাণ। মাসিক খরচের তালিকা, স্বামীর আয়ের প্রমাণ এবং বিয়ে ও সন্তানের কাগজ সংগ্রহ করুন।
- লিখিত দাবি। স্বামীর কাছে লিখিতভাবে ভরণপোষণ দাবি করুন এবং আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠান।
- আরজি দায়ের। পারিবারিক আদালতে আরজি দাখিল করুন, যেখানে দাবির পরিমাণ ও কারণ স্পষ্ট থাকবে।
- সমন ও জবাব। আদালত স্বামীকে সমন দেন এবং তিনি জবাব দাখিল করেন।
- অন্তর্বর্তী ভরণপোষণ। মামলা চলাকালে সংসার চালাতে অন্তর্বর্তী ভরণপোষণের আবেদন করা যায়।
- মীমাংসা ও শুনানি। আদালত প্রাক-বিচার মীমাংসার চেষ্টা করেন; ব্যর্থ হলে সাক্ষ্য নিয়ে রায় দেন।
- জারি। রায়ের পর টাকা না দিলে জারি মামলার মাধ্যমে আদায় করা হয়।
ভরণপোষণ মামলায় প্রয়োজনীয় প্রমাণ
- কাবিননামা বা বিয়ের প্রমাণ।
- সন্তানের জন্ম নিবন্ধন সনদ।
- স্বামীর আয়ের প্রমাণ, যেমন বেতনের কাগজ, ব্যবসার তথ্য, জমি-জমা বা ভাড়ার আয়।
- সংসার ও সন্তানের মাসিক খরচের হিসাব, স্কুলের বেতন ও চিকিৎসার রসিদ।
- আলাদা থাকার কারণ প্রমাণের কাগজ, যেমন নির্যাতনের অভিযোগ বা সাক্ষী।
- ভরণপোষণ চেয়ে পাঠানো চিঠি ও নোটিশ।
স্বামী প্রায়ই আদালতে নিজের আয় কম দেখান। তাই তার চাকরি, ব্যবসা, সম্পত্তি ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে যত তথ্য দেওয়া যায়, ভরণপোষণ মামলায় ন্যায্য পরিমাণ পাওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়ে।
বকেয়া ভরণপোষণ দাবি
স্বামী দীর্ঘদিন ভরণপোষণ না দিলে স্ত্রী শুধু ভবিষ্যতের নয়, অতীতের বকেয়া ভরণপোষণও দাবি করতে পারেন। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ দেখে বকেয়া ভরণপোষণ মঞ্জুর করতে পারেন, তবে কত বছরের বকেয়া পাওয়া যাবে তা তামাদি আইন, আদালতের নজির ও মামলার তথ্যের ওপর নির্ভর করে। দেরি না করে দ্রুত ভরণপোষণ মামলা করা তাই সবচেয়ে নিরাপদ।
দেনমোহর ও ভরণপোষণ একসঙ্গে
অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী একই সঙ্গে দেনমোহর ও ভরণপোষণ দুটিই পান না। পারিবারিক আদালতে একই মামলায় দুটি দাবি যুক্ত করা যায়, যা সময় ও খরচ বাঁচায়। তালাকের পর সাধারণত অপরিশোধিত দেনমোহর, ইদ্দতকালের ভরণপোষণ এবং সন্তানের ভরণপোষণ একসঙ্গে দাবি করা হয়। দেনমোহর আদায় নিয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের দেনমোহর বিষয়ক লেখা পড়ুন।
রায়ের পর টাকা আদায়
ভরণপোষণের ডিক্রি পাওয়ার পর স্বামী নিয়মিত টাকা না দিলে স্ত্রী জারি মামলা করতে পারেন। আদালত স্বামীর সম্পত্তি ক্রোক, বেতন থেকে সরাসরি কর্তন বা অন্যান্য আইনসম্মত উপায়ে টাকা আদায়ের আদেশ দিতে পারেন। চাকরিজীবী স্বামীর ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাকে বেতন থেকে টাকা কেটে দেওয়ার আদেশ বেশ কার্যকর। আইন অনুযায়ী আদালত প্রয়োজনে দেওয়ানি কারাদণ্ডের আদেশও দিতে পারেন।
স্বামী বিদেশে থাকলে বা সম্পত্তি লুকিয়ে রাখলে আদায় কঠিন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তার জমি, ব্যাংক হিসাব বা ব্যবসার তথ্য খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাবা-মায়ের ভরণপোষণ
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ অনুযায়ী সক্ষম সন্তানকে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ দিতে হয়। একাধিক সন্তান থাকলে তারা আলোচনার মাধ্যমে দায়িত্ব ভাগ করবেন। সন্তান ভরণপোষণ না দিলে বাবা-মা প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে লিখিত অভিযোগ করতে পারেন, এবং আইনে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান আছে। আদালত বিষয়টি আপস-মীমাংসার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছেও পাঠাতে পারেন। এটি স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ মামলা থেকে আলাদা প্রক্রিয়া।
অন্য ধর্মের নারীদের ক্ষেত্রে
হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী নারীরাও পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণের মামলা করতে পারেন, এবং তাদের অধিকার নিজ নিজ ব্যক্তিগত আইনে নির্ধারিত হয়। এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৮ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণের আবেদন করার বিধান আছে, যা ধর্ম নির্বিশেষে প্রযোজ্য। কোন ফোরাম আপনার জন্য উপযুক্ত, তা আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন।
ভরণপোষণের পরিমাণ কীভাবে ঠিক হয়
আইনে ভরণপোষণের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক বা শতাংশ বেঁধে দেওয়া নেই। প্রতিটি ভরণপোষণ মামলায় আদালত নিজের বিবেচনায় পরিমাণ ঠিক করেন। সাধারণত যেসব বিষয় বিবেচনায় আসে:
- স্বামী বা বাবার মাসিক আয়, সম্পত্তি ও আয়ের অন্যান্য উৎস।
- পরিবারের সামাজিক অবস্থান ও বিয়ের সময়ের জীবনযাত্রার মান।
- স্ত্রী ও সন্তানের প্রকৃত খরচ, যেমন বাসাভাড়া, খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও পড়াশোনা।
- স্বামীর অন্য দায়িত্ব, যেমন অন্য স্ত্রী বা সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মা।
- দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি।
আদালত অনেক সময় প্রতি বছর নির্দিষ্ট হারে ভরণপোষণ বাড়ানোর আদেশ দেন, যাতে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় হয়। পরিস্থিতি বদলালে, যেমন স্বামীর আয় বাড়লে বা সন্তানের পড়াশোনার খরচ বাড়লে, পরিমাণ বাড়ানোর জন্য নতুন করে আবেদন করা যায়।
অন্তর্বর্তী ভরণপোষণ কেন গুরুত্বপূর্ণ
একটি ভরণপোষণ মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগতে পারে। এই সময়ে স্ত্রী ও সন্তানের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই মামলা দায়েরের সঙ্গে সঙ্গে বা পরে অন্তর্বর্তী ভরণপোষণের আবেদন করা যায়। আদালত প্রাথমিক কাগজপত্র দেখে মামলা চলাকালীন সময়ের জন্য একটি মাসিক অঙ্ক নির্ধারণ করতে পারেন। স্বামী এই আদেশ না মানলে তা আদালতের কাছে তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক বিবেচনা তৈরি করে এবং আদায়ের ব্যবস্থাও নেওয়া যায়।
স্বামীর সাধারণ আপত্তি ও তার জবাব
ভরণপোষণ মামলায় স্বামী পক্ষ প্রায়ই কয়েকটি যুক্তি দেয়:
- "স্ত্রী নিজে চলে গেছেন।" আলাদা থাকার যুক্তিসঙ্গত কারণ প্রমাণ করতে পারলে এই আপত্তি টেকে না।
- "আমার আয় খুব কম।" আদালত চাকরি, ব্যবসা, সম্পত্তি ও জীবনযাত্রা দেখে প্রকৃত আয় বিবেচনা করেন।
- "আমি নিয়মিত টাকা দিয়েছি।" পরিশোধের দাবি প্রমাণের দায় স্বামীর; ব্যাংক বা মোবাইল লেনদেনের রেকর্ড এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
- "সন্তান আমার নয়।" বৈধ বিয়ের মধ্যে জন্ম নেওয়া সন্তানের পিতৃত্ব আইনে অনুমিত হয়; উল্টো দাবি প্রমাণ করা কঠিন।
মামলার খরচ, সময় ও আইনি সহায়তা
পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণ মামলার কোর্ট ফি নির্ধারিত ও কম। প্রধান খরচ আইনজীবীর ফি, নোটিশ ও যাতায়াত। আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার জেলা লিগ্যাল এইড অফিস থেকে বিনামূল্যে আইনজীবী ও পরামর্শ পাওয়া যেতে পারে। লিগ্যাল এইড অফিস অনেক সময় মামলার আগে দুই পক্ষকে ডেকে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টাও করে।
সময় কমাতে মামলার শুরু থেকেই সম্পূর্ণ কাগজপত্র জমা দিন, স্বামীর সঠিক ঠিকানা দিন এবং প্রতিটি শুনানিতে উপস্থিত থাকুন। সাক্ষীদের আগে থেকেই প্রস্তুত রাখলে শুনানি দ্রুত শেষ হয়।

আপস ও লিখিত সমঝোতা
সব ভরণপোষণ মামলা রায় পর্যন্ত যায় না। অনেক ক্ষেত্রে আইনি নোটিশ পাওয়ার পর বা আদালতের মীমাংসা পর্যায়ে স্বামী নির্দিষ্ট অঙ্কে নিয়মিত টাকা দিতে রাজি হন। যেকোনো সমঝোতা লিখিত হওয়া উচিত, যেখানে মাসিক অঙ্ক, পরিশোধের তারিখ, পদ্ধতি (ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং) এবং বার্ষিক বৃদ্ধির হার উল্লেখ থাকবে। সমঝোতাটি আদালতের আদেশে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে পরে খেলাপ হলে সরাসরি জারি করা যায়।
প্রবাসী স্বামীর বিরুদ্ধে ভরণপোষণ
অনেক পরিবারে স্বামী মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ বা অন্য দেশে কাজ করেন এবং দেশে স্ত্রী-সন্তানের খরচ বন্ধ করে দেন। এমন ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণ মামলা করা যায়। সমন পাঠানো ও শুনানিতে সময় বেশি লাগতে পারে, তবে বাংলাদেশে স্বামীর জমি, বাড়ি বা ব্যাংক হিসাব থাকলে সেখান থেকে আদায় সম্ভব। স্বামীর কর্মস্থল ও দেশে আসা-যাওয়ার তথ্য জানা থাকলে আইনজীবী উপযুক্ত কৌশল নিতে পারেন।
নারীদের জন্য কিছু পরামর্শ
- সংসারের খরচ ও সন্তানের পড়াশোনা-চিকিৎসার রসিদ গুছিয়ে রাখুন।
- স্বামীর আয়, চাকরি ও সম্পত্তির তথ্য যতটা সম্ভব সংগ্রহ করুন।
- টাকা পেলে তারিখ ও অঙ্ক লিখে রাখুন, সম্ভব হলে ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিন।
- চাপের মুখে কোনো কাগজে স্বাক্ষর করবেন না।
- দেরি না করে দ্রুত আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
এই সতর্কতাগুলো একটি ভরণপোষণ মামলাকে শক্তিশালী করে এবং দ্রুত ন্যায্য ফল পেতে সাহায্য করে। মনে রাখবেন, ভরণপোষণ আপনার ও আপনার সন্তানের আইনগত অধিকার; এটি চাইতে সংকোচ বা লজ্জার কিছু নেই। আদালত, লিগ্যাল এইড অফিস এবং অভিজ্ঞ আইনজীবী এই অধিকার রক্ষায় আপনার পাশে আছেন, তাই প্রয়োজন হলে দেরি না করে সাহায্য চান।
একটি কাল্পনিক উদাহরণ
ধরা যাক, সালমা ও রফিকের বিয়ের আট বছর পর রফিক দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং সালমা ও তাদের দুই সন্তানের খরচ দেওয়া বন্ধ করে দেন। সালমা সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। রফিক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং গ্রামে তার নামে জমি আছে। সালমা আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠান, কিন্তু রফিক সাড়া দেন না।
সালমা নিজের এলাকার পারিবারিক আদালতে নিজের ও দুই সন্তানের ভরণপোষণ মামলা করেন এবং একই মামলায় অপরিশোধিত দেনমোহরও দাবি করেন। তিনি সন্তানদের স্কুলের বেতনের রসিদ, চিকিৎসার কাগজ, রফিকের চাকরির তথ্য ও দ্বিতীয় বিয়ের প্রমাণ জমা দেন। আদালত মামলা চলাকালে অন্তর্বর্তী ভরণপোষণের আদেশ দেন এবং পরে রায়ে সালমা ও সন্তানদের জন্য মাসিক ভরণপোষণ, বকেয়া ভরণপোষণ এবং দেনমোহর মঞ্জুর করেন। রফিক টাকা না দেওয়ায় সালমা জারি মামলা করেন, এবং আদালত রফিকের নিয়োগকর্তাকে বেতন থেকে টাকা কেটে আদালতে জমা দেওয়ার আদেশ দেন। উদাহরণটি কাল্পনিক, তবে বাস্তবে অনেক মামলা এভাবেই এগোয়।
দ্বিতীয় বিয়ে ও ভরণপোষণ
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী বর্তমান স্ত্রী থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ে করতে হলে সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি লাগে। অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্বামীকে প্রথম স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর অবিলম্বে পরিশোধ করতে হয় এবং তিনি দণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন। দ্বিতীয় বিয়ে প্রথম স্ত্রীর আলাদা থাকার যুক্তিসঙ্গত কারণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, ফলে তার ভরণপোষণের অধিকার বহাল থাকে। এমন পরিস্থিতিতে প্রথম স্ত্রী ভরণপোষণ মামলার পাশাপাশি দেনমোহর ও প্রয়োজনে বিয়ে বিচ্ছেদের প্রতিকারও চাইতে পারেন।
ভরণপোষণ ও নারী নির্যাতন সংক্রান্ত আইন
অনেক ক্ষেত্রে ভরণপোষণ বন্ধ করার সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতাও জড়িত থাকে। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ অনুযায়ী ভুক্তভোগী নারী সুরক্ষা আদেশ, বসবাসের আদেশ এবং ক্ষতিপূরণের আদেশ চাইতে পারেন, যেখানে আর্থিক সহায়তার বিষয়ও থাকতে পারে। এই আইনের প্রতিকার পারিবারিক আদালতের ভরণপোষণ মামলার বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক। পরিস্থিতি অনুযায়ী দুই আইনের প্রতিকার একসঙ্গে ব্যবহার করা যায় কি না, তা আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন। জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ (নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ) বা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
আদেশ পরিবর্তন ও বাতিল
ভরণপোষণের আদেশ স্থায়ী নয়। স্বামীর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে বা কমলে, সন্তানের খরচ বাড়লে, অথবা সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে বা মেয়ের বিয়ে হলে যেকোনো পক্ষ আদেশ পরিবর্তনের আবেদন করতে পারেন। তালাক কার্যকর হলে স্ত্রীর নিজের ভরণপোষণ ইদ্দতকাল শেষে বন্ধ হয়, কিন্তু সন্তানের ভরণপোষণ চলতে থাকে। পরিবর্তনের আবেদনেও প্রমাণ লাগে, তাই আয় ও খরচের সর্বশেষ কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন।
আইনজীবী নির্বাচনের সময় যা দেখবেন
পারিবারিক মামলায় অভিজ্ঞ এবং নারী ও শিশুর অধিকার বিষয়ে সংবেদনশীল আইনজীবী বেছে নিন। প্রথম সাক্ষাতে কাবিননামা, সন্তানের জন্ম নিবন্ধন, খরচের রসিদ ও স্বামীর আয়ের তথ্য সঙ্গে নিয়ে যান। খরচ, সম্ভাব্য সময় ও কৌশল নিয়ে স্পষ্ট আলোচনা করুন। একজন দক্ষ আইনজীবী শুধু আদালতে লড়াই নয়, প্রয়োজনে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ও টেকসই সমাধানেও সাহায্য করতে পারেন। সময়মতো সঠিক পরামর্শ নিলে একটি ভরণপোষণ মামলা অনেক সহজ ও কার্যকর হয়।
সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার বিশেষ খরচ
নিয়মিত মাসিক ভরণপোষণের বাইরে সন্তানের ভর্তি ফি, কোচিং, পরীক্ষার ফি, বড় অসুখ বা অস্ত্রোপচারের মতো বিশেষ খরচ থাকতে পারে। মামলায় এসব খরচ আলাদাভাবে উল্লেখ করে দাবি করা যায়, অথবা সমঝোতায় লেখা যায় যে এ ধরনের খরচ বাবা নির্দিষ্ট অনুপাতে বহন করবেন। এতে ভবিষ্যতে নতুন করে বিরোধ কমে এবং সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হয় না।
ভরণপোষণ মামলা নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
বাবার বাড়িতে থাকলেও কি ভরণপোষণ পাব?
যুক্তিসঙ্গত কারণে আলাদা থাকলে সাধারণত হ্যাঁ। কারণ ছাড়া স্বামীর সঙ্গে থাকতে অস্বীকার করলে দাবি দুর্বল হতে পারে।
তালাকের পর কতদিন ভরণপোষণ পাব?
সাধারণত ইদ্দতকাল পর্যন্ত। গর্ভবতী হলে সন্তান জন্ম পর্যন্ত।
সন্তান আমার কাছে থাকলে কি বাবাকে ভরণপোষণ দিতে হবে?
হ্যাঁ। সন্তান যার হেফাজতেই থাকুক, ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবার।
মামলা কোথায় করব?
সাধারণত আপনি যে এলাকায় থাকেন, সেই এলাকার পারিবারিক আদালতে।
বকেয়া ভরণপোষণ কি পাওয়া যায়?
প্রমাণ সাপেক্ষে আদালত বকেয়া ভরণপোষণ দিতে পারেন, তবে সময়সীমার বিষয় আছে।
রায়ের পর টাকা না দিলে কী করব?
জারি মামলা করুন। আদালত বেতন কর্তন বা সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দিতে পারেন।
আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি
আমরা স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মায়ের পক্ষে ভরণপোষণ মামলা পরিচালনা করি: খরচের হিসাব ও প্রমাণ প্রস্তুত, আইনি নোটিশ, পারিবারিক আদালতে মামলা, অন্তর্বর্তী ভরণপোষণ, মীমাংসা এবং ডিক্রি জারি। ব্যারিস্টার মেহেরুবা মাহবুব সম্পর্কে জানতে আমাদের পরিচিতি পাতা দেখুন।
ভরণপোষণ পাচ্ছেন না?
আপনার পরিস্থিতি শুনে আমরা দ্রুত ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপের পরিকল্পনা দেব।
পরামর্শ বুক করুনআমাদের সম্পর্কেপ্রাথমিক উৎস: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ ও ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮, বাংলাদেশ আইন পোর্টাল; বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা।
এই লেখাটি অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের পারিবারিক আইন সম্পর্কে সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। প্রতিটি মামলার তথ্য আলাদা; পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।



0 Comments