Meheruba Mahbub — Global Header Mega Menu

সন্তানের অভিভাবকত্ব: 7টি জরুরি আইনি নিয়ম ও হেফাজতের মামলা গাইড 2026

by Barrister Meheruba Mahbub | Nov 4, 2026 | Bangladesh Law, Family Law | 0 comments

বিচ্ছেদ বা পারিবারিক বিরোধের সময় সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত। শিশু কার কাছে থাকবে, কে তার পড়াশোনা ও সম্পত্তির সিদ্ধান্ত নেবেন, অন্য পক্ষ কীভাবে দেখা করবেন, এসব প্রশ্নের উত্তর দেয় অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০, মুসলিম ও অন্যান্য ব্যক্তিগত আইন এবং উচ্চ আদালতের রায়। সব ক্ষেত্রেই আদালতের মূল বিবেচ্য বিষয় শিশুর সর্বোত্তম কল্যাণ।

সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত গাইড
এই লেখায় যা আছে
মূল বিষয়গুলো
  • আইনে অভিভাবকত্ব (guardianship) আর হেফাজত (custody) আলাদা বিষয়; একজন অভিভাবক হলেও শিশু অন্যজনের হেফাজতে থাকতে পারে।
  • মুসলিম আইনে সাধারণত বাবা শিশুর স্বাভাবিক অভিভাবক এবং মা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত হেফাজতের (হিজানত) অধিকারী।
  • তবে উচ্চ আদালত বারবার বলেছেন, বয়সের নিয়মের চেয়ে শিশুর সর্বোত্তম কল্যাণই চূড়ান্ত বিবেচ্য।
  • সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজতের মামলা পারিবারিক আদালতে করতে হয়, এবং আদালত দেখা করার অধিকারও ঠিক করে দিতে পারেন।
  • যে বাবা-মায়ের কাছেই শিশু থাকুক, বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব থেকে যায়।

অভিভাবকত্ব ও হেফাজত: পার্থক্য বুঝুন

সাধারণ মানুষ প্রায়ই অভিভাবকত্ব আর হেফাজতকে একই মনে করেন, কিন্তু আইনে দুটি আলাদা। অভিভাবকত্ব মানে শিশুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং তার সম্পত্তি দেখাশোনার আইনগত ক্ষমতা ও দায়িত্ব। যেমন স্কুল নির্বাচন, চিকিৎসার সম্মতি, পাসপোর্টের আবেদন বা শিশুর নামে থাকা সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা। অন্যদিকে হেফাজত মানে শিশু দৈনন্দিনভাবে কার সঙ্গে থাকবে এবং কে তার প্রতিদিনের যত্ন নেবেন।

তাই সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে কথা বলার সময় দুটি প্রশ্ন আলাদাভাবে ভাবতে হয়: সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার, আর শিশু কার কাছে থাকবে। অনেক ক্ষেত্রে বাবা অভিভাবক থাকেন, অথচ শিশু মায়ের হেফাজতে থাকে। আবার আদালত প্রয়োজনে মা বা অন্য কাউকে অভিভাবক নিয়োগ করতে পারেন।

তিন ধরনের অভিভাবকত্ব

মুসলিম আইনে শিশুর শরীর বা ব্যক্তির অভিভাবকত্ব, সম্পত্তির অভিভাবকত্ব এবং বিয়ের অভিভাবকত্ব আলাদাভাবে আলোচনা করা হয়। অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০ অনুযায়ী আদালত শিশুর ব্যক্তি, সম্পত্তি অথবা উভয়ের জন্য অভিভাবক নিয়োগ বা ঘোষণা করতে পারেন।

প্রযোজ্য আইন

বাংলাদেশে সন্তানের অভিভাবকত্ব নির্ধারণে কয়েকটি আইন একসঙ্গে কাজ করে। অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০ সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য একটি সাধারণ আইন, যা আদালতকে অভিভাবক নিয়োগ ও হেফাজতের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। এই আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী আদালত শিশুর ব্যক্তিগত আইন বিবেচনা করবেন, তবে সিদ্ধান্ত নেবেন শিশুর কল্যাণের ভিত্তিতে।

মুসলিমদের ক্ষেত্রে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়াহ) এবং হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে তাদের নিজ নিজ ব্যক্তিগত আইন প্রাসঙ্গিক। পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ অনুযায়ী অভিভাবকত্ব ও হেফাজতের মামলা পারিবারিক আদালতে চলে। এছাড়া শিশু আইন ২০১৩ শিশুর অধিকার ও সুরক্ষার সাধারণ কাঠামো দেয়।

সন্তানের অভিভাবকত্ব মামলার ধাপ
হেফাজত বা অভিভাবকত্ব চাওয়ার সাধারণ ধাপ

মুসলিম আইনে বাবা ও মায়ের অধিকার

প্রচলিত হানাফি মুসলিম আইনে বাবাকে শিশুর স্বাভাবিক ও আইনগত অভিভাবক ধরা হয়। মা শিশুর হেফাজতের (হিজানত) অধিকারী; সাধারণভাবে ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে ৭ বছর পর্যন্ত এবং মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মা এই অধিকার পান। মায়ের অনুপস্থিতিতে নানি, দাদি ও অন্যান্য নারী আত্মীয় নির্দিষ্ট ক্রমে হেফাজতের অধিকারী হন।

বিষয়প্রচলিত নিয়মআদালতের দৃষ্টিভঙ্গি
স্বাভাবিক অভিভাবকবাবাশিশুর কল্যাণে প্রয়োজন হলে অন্যজনকে নিয়োগ করা যায়
ছেলে সন্তানের হেফাজতমা, সাধারণত ৭ বছর পর্যন্তকল্যাণ বিবেচনায় বয়সের পরেও মায়ের কাছে থাকতে পারে
মেয়ে সন্তানের হেফাজতমা, সাধারণত বয়ঃসন্ধি পর্যন্তকল্যাণই চূড়ান্ত বিবেচ্য
মায়ের পুনর্বিবাহপ্রচলিত মতে হেফাজত হারানোর কারণ হতে পারেস্বয়ংক্রিয় নয়; শিশুর কল্যাণ দেখে সিদ্ধান্ত

তবে এই বয়সসীমা আজ আর অন্ধভাবে প্রয়োগ হয় না। সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজতের প্রশ্নে আদালত শিশুর বয়স, লিঙ্গ, স্বাস্থ্য, পড়াশোনা, মানসিক বন্ধন, বাবা-মায়ের আচরণ ও আর্থিক অবস্থা সব বিবেচনা করেন।

শিশুর সর্বোত্তম কল্যাণ: আদালতের মূল নীতি

আবু বকর সিদ্দিকী বনাম এস এম এ বকর মামলায় (৩৮ ডিএলআর (এডি) ১০৬, ১৯৮৬) আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেন যে হিজানতের বয়সসীমা পার হলেও শিশুর কল্যাণের স্বার্থে তাকে মায়ের হেফাজতে রাখা যায়। এরপর বহু মামলায় উচ্চ আদালত এই নীতি অনুসরণ করেছেন। অর্থাৎ সন্তানের অভিভাবকত্ব বা হেফাজতের সিদ্ধান্তে কোনো বাবা বা মায়ের "অধিকার" নয়, বরং শিশুর ভালো থাকাই প্রধান।

আদালত সাধারণত যেসব বিষয় দেখেন:

  • শিশুর বয়স, লিঙ্গ ও শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য।
  • এখন পর্যন্ত শিশু কার কাছে বড় হয়েছে এবং কার সঙ্গে তার মানসিক বন্ধন বেশি।
  • শিশুর পড়াশোনা, স্কুল ও পরিবেশের ধারাবাহিকতা।
  • বাবা ও মায়ের চরিত্র, আচরণ, স্বাস্থ্য এবং যত্ন নেওয়ার সময় ও সামর্থ্য।
  • বাড়ির পরিবেশ ও নিরাপত্তা।
  • বুদ্ধিসম্পন্ন বয়সের শিশুর নিজের মতামত।

পারিবারিক আদালতে মামলা করার নিয়ম

সন্তানের অভিভাবকত্ব বা হেফাজত চাইতে বাবা, মা বা শিশুর অন্য আত্মীয় পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন। সাধারণত শিশু যে এলাকায় স্বাভাবিকভাবে বসবাস করে, সেই এলাকার আদালতে মামলা হয়। আরজিতে শিশুর পরিচয়, বয়স, বর্তমানে কার কাছে আছে, কেন আবেদনকারীর কাছে থাকা শিশুর জন্য ভালো, এবং প্রয়োজনে ভরণপোষণ ও দেখা করার দাবি উল্লেখ করতে হয়।

  1. পরিস্থিতি মূল্যায়ন। শিশুর কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে নিজের অবস্থান সৎভাবে বিবেচনা করুন।
  2. প্রমাণ সংগ্রহ। জন্ম নিবন্ধন, স্কুলের কাগজ, চিকিৎসার রেকর্ড, আয়ের প্রমাণ এবং শিশুর যত্নের প্রমাণ জোগাড় করুন।
  3. আপসের চেষ্টা। আত্মীয়, সালিশ বা আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিত সমঝোতার চেষ্টা করুন।
  4. মামলা দায়ের। পারিবারিক আদালতে আরজি দাখিল করুন।
  5. অন্তর্বর্তী আদেশ। মামলা চলাকালীন সময়ে হেফাজত বা দেখা করার অন্তর্বর্তী আদেশ চাওয়া যায়।
  6. শুনানি। আদালত প্রাক-বিচার মীমাংসার চেষ্টা করেন, তারপর সাক্ষ্য নেন এবং প্রয়োজনে শিশুর সঙ্গে কথা বলেন।
  7. রায় ও বাস্তবায়ন। রায় অনুযায়ী হেফাজত হস্তান্তর ও দেখা করার ব্যবস্থা কার্যকর হয়।

দেখা করার অধিকার (ভিজিটেশন)

যে বাবা বা মায়ের কাছে শিশু থাকে না, তারও শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার অধিকার আছে, এবং শিশুরও দুজনের ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার আছে। আদালত নির্দিষ্ট দিন, সময় ও স্থানে দেখা করার আদেশ দিতে পারেন, যেমন সপ্তাহে একদিন, ছুটির দিনে বা উৎসবে। প্রবাসী বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে ভিডিও কলের ব্যবস্থাও আদেশে রাখা যায়। সন্তানের অভিভাবকত্ব বিরোধে দেখা করার অধিকার নিশ্চিত করা শিশুর মানসিক সুস্থতার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

গুরুত্বপূর্ণ টিপস

আদালতের দেখা করার আদেশ মেনে চলুন এবং শিশুর সামনে অন্য পক্ষকে নিয়ে নেতিবাচক কথা বলবেন না। আদালত বাবা-মায়ের সহযোগিতামূলক আচরণকে শিশুর কল্যাণের বড় সূচক হিসেবে দেখেন।

শিশুর ভরণপোষণ

মুসলিম আইনে সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবার, শিশু যার হেফাজতেই থাকুক না কেন। ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত এবং মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে বিয়ে পর্যন্ত এই দায়িত্ব থাকে। মা হেফাজতের মামলার সঙ্গে একই আদালতে শিশুর ভরণপোষণের দাবিও করতে পারেন। আদালত বাবার আয় ও শিশুর প্রয়োজন বিবেচনা করে মাসিক ভরণপোষণ নির্ধারণ করেন। ভরণপোষণ নিয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ বিষয়ক লেখা দেখুন।

শিশুকে বিদেশে নেওয়া ও পাসপোর্ট

অভিভাবকত্বের বিরোধ চলাকালে এক পক্ষ শিশুকে বিদেশে নিয়ে যেতে পারেন, এমন আশঙ্কা থাকলে আদালতের কাছে শিশুকে দেশের বাইরে নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা চাওয়া যায়। অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন অনুযায়ী আদালতের নিয়োগ করা অভিভাবকের ক্ষেত্রে শিশুকে আদালতের এখতিয়ারের বাইরে নিতে অনুমতি লাগে। শিশুর পাসপোর্টের আবেদনে বাবা-মায়ের তথ্য ও সম্মতির বিষয় থাকে, তাই বিরোধের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট অফিসকে আদালতের আদেশ সম্পর্কে জানানো যেতে পারে। বাংলাদেশ হেগ শিশু অপহরণ কনভেনশনের সদস্য নয়, তাই বিদেশ থেকে শিশু ফিরিয়ে আনা জটিল; প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো উপায়।

মায়ের পুনর্বিবাহ ও হেফাজত

প্রচলিত মুসলিম আইনের মতে মা শিশুর সঙ্গে নিষিদ্ধ সম্পর্কের বাইরের কাউকে বিয়ে করলে হেফাজতের অধিকার হারাতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বলেছেন, পুনর্বিবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হেফাজত হারানোর কারণ নয়। নতুন পরিবারে শিশু নিরাপদ ও ভালো থাকবে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন। তাই সন্তানের অভিভাবকত্ব বা হেফাজতের মামলায় পুনর্বিবাহিত মা নিজের পরিস্থিতি ও শিশুর কল্যাণের প্রমাণ দিয়ে হেফাজত চাইতে পারেন।

শিশুর সম্পত্তির অভিভাবকত্ব

শিশু উত্তরাধিকার বা দানের মাধ্যমে জমি, টাকা বা অন্য সম্পত্তি পেলে তার ব্যবস্থাপনার জন্য অভিভাবক প্রয়োজন হয়। আদালত নিযুক্ত অভিভাবক আদালতের অনুমতি ছাড়া শিশুর স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দিতে পারেন না। শিশুর সম্পত্তি বিক্রির প্রয়োজন হলে আদালতে আবেদন করে অনুমতি নিতে হয় এবং আদালত শিশুর স্বার্থ রক্ষার শর্ত দিতে পারেন। উত্তরাধিকার নিয়ে জানতে আমাদের ওয়ারিশ সনদ বিষয়ক লেখা পড়ুন।

হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের পরিবারে

হিন্দু আইনে সাধারণত বাবা এবং তার পরে মা শিশুর স্বাভাবিক অভিভাবক। খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রে অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ও তাদের ব্যক্তিগত আইন প্রযোজ্য। তবে সব ধর্মের ক্ষেত্রেই আদালত শিশুর কল্যাণকে প্রধান বিবেচ্য হিসেবে দেখেন। ফলে সন্তানের অভিভাবকত্ব নির্ধারণে ধর্ম নির্বিশেষে একই মৌলিক নীতি কাজ করে।

মামলার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

সন্তানের অভিভাবকত্ব বা হেফাজতের মামলায় প্রমাণ যত গোছানো, আদালতের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরা তত সহজ। সাধারণত যেসব কাগজ কাজে লাগে:

  • শিশুর জন্ম নিবন্ধন সনদ ও বয়সের প্রমাণ।
  • কাবিননামা, তালাকনামা বা বিচ্ছেদের কাগজ।
  • শিশুর স্কুলের ভর্তি, ফলাফল ও উপস্থিতির কাগজ।
  • শিশুর চিকিৎসা ও টিকার রেকর্ড, বিশেষ করে কোনো বিশেষ চাহিদা থাকলে।
  • আবেদনকারীর আয়, চাকরি ও বাসস্থানের প্রমাণ।
  • শিশুর যত্নে নিজের ভূমিকার প্রমাণ, যেমন ছবি, স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রতিবেশী বা আত্মীয় সাক্ষী।
  • অন্য পক্ষের অবহেলা বা ক্ষতিকর আচরণের প্রমাণ থাকলে তা।

সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে মামলা করার আগে একজন আইনজীবীর সঙ্গে বসে এই কাগজগুলো পর্যালোচনা করলে কোন দাবি জোরালো আর কোনটি দুর্বল তা পরিষ্কার হয়।

মামলায় সময় ও খরচ

পারিবারিক আদালতে কোর্ট ফি নির্ধারিত ও তুলনামূলকভাবে কম, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে প্রতিকার চাইতে পারেন। তবে সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজতের মামলায় সাক্ষ্য, শিশুর সঙ্গে আদালতের কথা বলা এবং অন্তর্বর্তী আদেশের শুনানির কারণে সময় লাগতে পারে। মামলাজট ও শুনানি মুলতবিও সময় বাড়ায়। আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে প্রতিটি জেলার লিগ্যাল এইড অফিস থেকে বিনামূল্যে আইনজীবী পাওয়া যেতে পারে।

শিশুর জন্য দীর্ঘ মামলা মানসিক চাপ তৈরি করে। তাই অনেক ক্ষেত্রে আদালতের প্রাক-বিচার মীমাংসা পর্যায়ে বাবা-মা একটি লিখিত প্যারেন্টিং চুক্তিতে পৌঁছাতে পারলে তা শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো হয়।

আপসে প্যারেন্টিং চুক্তি

সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত নিয়ে আদালতে লড়াইয়ের বদলে বাবা-মা নিজেরা একটি লিখিত চুক্তি করতে পারেন। এই চুক্তিতে থাকতে পারে শিশু কার কাছে থাকবে, অন্যজন কবে ও কীভাবে দেখা করবেন, ছুটি ও উৎসব কীভাবে ভাগ হবে, পড়াশোনা ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে, এবং ভরণপোষণের পরিমাণ ও পরিশোধের পদ্ধতি। চুক্তিটি আদালতের আদেশের অংশ করে নিলে পরে কেউ না মানলে আদালতের মাধ্যমে কার্যকর করা সহজ হয়।

ভালো প্যারেন্টিং চুক্তি শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনের সুযোগ রাখে। যেমন স্কুল পরিবর্তন, বাসস্থান পরিবর্তন বা বিদেশে পড়াশোনার মতো বিষয়ে আগাম আলোচনা ও সিদ্ধান্তের পদ্ধতি লিখে রাখা যায়।

সন্তানের অভিভাবকত্ব মূল তথ্য
অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত মূল আইনি তথ্য

আদেশ পরিবর্তন ও বাস্তবায়ন

সন্তানের অভিভাবকত্ব বা হেফাজতের আদেশ চিরস্থায়ী নয়। পরিস্থিতি বদলালে, যেমন শিশুর বয়স বাড়লে, যার হেফাজতে আছে তার আচরণ বা অবস্থা খারাপ হলে, কিংবা শিশুর নিজের ইচ্ছা স্পষ্টভাবে বদলালে, আদালতে আদেশ পরিবর্তনের আবেদন করা যায়। আদালত আবারও শিশুর কল্যাণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।

কেউ হেফাজত বা দেখা করার আদেশ না মানলে আদালতে আবেদন করে আদেশ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা চাওয়া যায়। প্রয়োজনে আদালত পুলিশের সহায়তায় শিশু হস্তান্তরের আদেশ দিতে পারেন। জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন শিশুকে জোর করে আটকে রাখা হলে, হাইকোর্ট বিভাগে হেবিয়াস কর্পাস রিট আবেদনও করা যায়। রিট সম্পর্কে জানতে আমাদের রিট মামলা বিষয়ক লেখা পড়ুন।

প্রবাসী বাবা-মা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি

বাবা বা মা বিদেশে থাকলে সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ আরও জটিল হয়। এক দেশের আদালতের আদেশ আরেক দেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না। বিদেশি আদালতের হেফাজতের আদেশ বাংলাদেশের আদালত বিবেচনায় নিতে পারেন, তবে শেষ পর্যন্ত শিশুর কল্যাণ দেখেই সিদ্ধান্ত নেন। প্রবাসী অভিভাবক পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে বাংলাদেশে মামলা পরিচালনা করতে পারেন, যদিও গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে উপস্থিত থাকা ভালো। আন্তর্জাতিক বিরোধে দুই দেশের আইনজীবীর সমন্বয় অনেক সময় জরুরি হয়ে পড়ে।

বাবা-মায়ের জন্য কিছু পরামর্শ

  • শিশুকে বিরোধের মধ্যে টেনে আনবেন না এবং তাকে কারো পক্ষ নিতে বাধ্য করবেন না।
  • অন্য পক্ষ সম্পর্কে শিশুর সামনে নেতিবাচক কথা বলবেন না।
  • শিশুর পড়াশোনা ও দৈনন্দিন রুটিন যতটা সম্ভব স্থির রাখুন।
  • সব যোগাযোগ শালীন ও লিখিত রাখার চেষ্টা করুন।
  • আদালতের প্রতিটি আদেশ মেনে চলুন, এমনকি তা আপনার পছন্দ না হলেও।
  • প্রয়োজনে শিশুর জন্য কাউন্সেলিং সহায়তা নিন।

এই আচরণগুলো শুধু শিশুর জন্যই ভালো নয়, সন্তানের অভিভাবকত্ব মামলায় আদালতের কাছেও আপনাকে দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে তুলে ধরে।

বাবা-মা কেউ না থাকলে কে অভিভাবক হবেন

বাবা মারা গেলে বা বাবা-মা দুজনেই না থাকলে সন্তানের অভিভাবকত্ব কে পাবেন, তা নিয়ে প্রায়ই পরিবারের মধ্যে বিরোধ হয়। মুসলিম আইনে বাবার মৃত্যুর পর বাবার উইলে নিযুক্ত অভিভাবক, তারপর দাদা এবং দাদার উইলে নিযুক্ত ব্যক্তি সম্পত্তির অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হন। তবে বাস্তবে শিশু অনেক সময় মা, নানি বা অন্য নিকটাত্মীয়ের কাছে থাকে। এমন ক্ষেত্রে মা বা যে আত্মীয় শিশুর দেখাশোনা করছেন, তিনি আদালতে আবেদন করে নিজেকে অভিভাবক নিয়োগের আদেশ নিতে পারেন।

এই আদেশ থাকলে শিশুর স্কুলে ভর্তি, ব্যাংক হিসাব খোলা, পাসপোর্ট করা বা উত্তরাধিকারের সম্পত্তি দেখাশোনা অনেক সহজ হয়। সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে আত্মীয়দের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলে আদালত শিশুর সঙ্গে কার বন্ধন বেশি, কে বাস্তবে যত্ন নিচ্ছেন এবং কে শিশুর সম্পত্তির প্রতি সৎ থাকবেন, এসব বিবেচনা করেন।

সন্তানের অভিভাবকত্ব ও শিশুর অধিকার

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী দেশ, এবং শিশু আইন ২০১৩ এই সনদের মূল নীতিগুলো দেশীয় আইনে প্রতিফলিত করেছে। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, মতামত প্রকাশের অধিকার এবং বাবা-মা দুজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার অধিকার এই নীতিগুলোর অংশ। তাই সন্তানের অভিভাবকত্ব নির্ধারণে আধুনিক আদালত শুধু বাবা-মায়ের দাবি নয়, শিশুর নিজের অধিকার ও অনুভূতিকেও গুরুত্ব দেন। বুদ্ধিসম্পন্ন বয়সের শিশুর সঙ্গে বিচারক অনেক সময় খাসকামরায় আলাদাভাবে কথা বলেন, যাতে শিশু চাপমুক্তভাবে মত দিতে পারে।

সাধারণ ভুল ধারণা

  • "৭ বছর হলেই ছেলে বাবার কাছে যাবে।" বয়সসীমা প্রচলিত নিয়ম মাত্র; আদালত শিশুর কল্যাণ দেখে ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
  • "মা আবার বিয়ে করলে হেফাজত পাবেন না।" এটি স্বয়ংক্রিয় নয়; শিশুর কল্যাণই মূল বিবেচ্য।
  • "হেফাজত না পেলে ভরণপোষণ দিতে হবে না।" ভুল। সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবার থেকেই যায়।
  • "শিশুকে নিয়ে চলে গেলে হেফাজত নিজের হয়ে যায়।" জোর করে নিয়ে যাওয়া আদালতের চোখে নেতিবাচক আচরণ।

এসব ভুল ধারণা থেকে বের হয়ে আইনজীবীর পরামর্শে সন্তানের অভিভাবকত্ব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে শিশু ও পরিবার দুই-ই সুরক্ষিত থাকে।

একটি কাল্পনিক উদাহরণ

ধরা যাক, নাসরিন ও করিমের বিচ্ছেদের পর তাদের ৯ বছরের ছেলে আরিফ মায়ের কাছে থাকে। করিম দাবি করেন, ছেলের বয়স ৭ পেরিয়েছে, তাই হেফাজত তার পাওয়া উচিত। নাসরিন আদালতে দেখান যে আরিফ জন্ম থেকে তার কাছে বড় হয়েছে, স্থানীয় স্কুলে ভালো ফল করছে এবং নানির পরিবারে নিরাপদ পরিবেশে আছে, অথচ করিম কাজের কারণে অধিকাংশ সময় অন্য শহরে থাকেন। আরিফও বিচারকের সঙ্গে কথা বলার সময় মায়ের কাছে থাকার ইচ্ছা জানায়।

এমন পরিস্থিতিতে আদালত সাধারণত শিশুর কল্যাণ বিবেচনা করে মায়ের কাছে হেফাজত বহাল রাখতে পারেন, আর করিমকে নিয়মিত দেখা করার সুযোগ ও ছুটিতে ছেলেকে নিজের কাছে রাখার ব্যবস্থা দিতে পারেন। একই সঙ্গে করিমকে মাসিক ভরণপোষণ দিতে আদেশ দেওয়া হতে পারে। উদাহরণটি কাল্পনিক, তবে এটি দেখায় কীভাবে সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজতের প্রশ্নে কল্যাণ নীতি কাজ করে।

আইনজীবী নির্বাচনের সময় যা দেখবেন

পারিবারিক মামলায় অভিজ্ঞ আইনজীবী বেছে নিন, যিনি শিশুর কল্যাণ নীতি ও উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক রায় সম্পর্কে জানেন। তিনি যেন আপসের সম্ভাবনা গুরুত্ব দেন, আবার প্রয়োজনে দৃঢ়ভাবে আদালতে আপনার পক্ষ উপস্থাপন করতে পারেন। প্রথম সাক্ষাতেই খরচ, সম্ভাব্য সময় ও কৌশল নিয়ে স্পষ্ট আলোচনা করুন এবং সব কাগজের কপি সঙ্গে নিয়ে যান। সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে দ্রুত সঠিক পরামর্শ নিলে অনেক ভুল ও ভোগান্তি এড়ানো যায়।

সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন

তালাকের পর সন্তান কার কাছে থাকবে?

প্রচলিত নিয়মে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মা হেফাজত পান, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় শিশুর সর্বোত্তম কল্যাণ বিবেচনায়।

মা কি অভিভাবক হতে পারেন?

হ্যাঁ। শিশুর কল্যাণে প্রয়োজন হলে আদালত মাকে শিশুর ব্যক্তি বা সম্পত্তির অভিভাবক নিয়োগ করতে পারেন।

মামলা কোথায় করতে হয়?

পারিবারিক আদালতে, সাধারণত শিশু যে এলাকায় বসবাস করে সেখানে।

বাবা কি সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন?

হ্যাঁ। আদালত দেখা করার সময়সূচি নির্ধারণ করে দিতে পারেন।

শিশু মায়ের কাছে থাকলে কি বাবার ভরণপোষণের দায় থাকে?

হ্যাঁ। হেফাজত যার কাছেই থাকুক, সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবার।

শিশুর মতামত কি গুরুত্ব পায়?

বুদ্ধিসম্পন্ন বয়সের শিশুর মতামত আদালত বিবেচনা করেন, তবে একমাত্র ভিত্তি হিসেবে নয়।

আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি

আমরা সন্তানের অভিভাবকত্ব, হেফাজত, দেখা করার অধিকার, শিশুর ভরণপোষণ এবং শিশুকে বিদেশে নেওয়া সংক্রান্ত বিরোধে বাবা-মা ও পরিবারকে সহায়তা করি। আপস আলোচনা থেকে পারিবারিক আদালত ও উচ্চ আদালত পর্যন্ত আমরা পাশে থাকি। ব্যারিস্টার মেহেরুবা মাহবুব সম্পর্কে জানতে আমাদের পরিচিতি পাতা দেখুন।

যোগাযোগ করুন

সন্তানের হেফাজত নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন?

আপনার পরিস্থিতি গোপনীয়তার সঙ্গে শুনে আমরা শিশুর কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে কার্যকর আইনি পথ দেখাব।

পরামর্শ বুক করুনআমাদের সম্পর্কে

প্রাথমিক উৎস: অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০, পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ ও শিশু আইন ২০১৩, বাংলাদেশ আইন পোর্টাল; বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা।

এই লেখাটি অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের পারিবারিক আইন সম্পর্কে সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। প্রতিটি মামলার তথ্য আলাদা; পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

Written by

Related Posts

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *