জমির মালিক হলে প্রতি বছর ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা দেওয়া আইনগত দায়িত্ব। এখন আর তহসিল অফিসে লাইনে দাঁড়াতে হয় না: মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে নিবন্ধন করে, হোল্ডিং যুক্ত করে, অনলাইনে টাকা দিয়ে কিউআর কোডসহ দাখিলা ডাউনলোড করা যায়। এই লেখায় পুরো প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হলো।

- ভূমি উন্নয়ন কর আইন ২০২৩ পুরনো ভূমি উন্নয়ন কর অধ্যাদেশ ১৯৭৬ বাতিল করে নতুন কাঠামো তৈরি করেছে।
- ১ জুলাই ২০২৪ থেকে খাজনা আদায়ের বছর বাংলা সনের বদলে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন, অর্থাৎ অর্থবছর।
- কৃষিনির্ভর ব্যক্তি বা পরিবারের মোট কৃষিজমি ২৫ বিঘা পর্যন্ত হলে কৃষিজমির খাজনা মওকুফ; অকৃষি জমির কর সবাইকে দিতে হয়।
- খাজনা এখন অনলাইনে দিতে হয় এবং পরিশোধের পর কিউআর কোডযুক্ত দাখিলা পাওয়া যায়।
- বকেয়া খাজনার ওপর বার্ষিক ৬.২৫ শতাংশ হারে সুদ যোগ হয় এবং দীর্ঘ বকেয়া সার্টিফিকেট মামলায় আদায় করা যায়।
ভূমি উন্নয়ন কর কী এবং কেন দিতে হয়
জমি ব্যবহারের বিনিময়ে সরকারকে প্রতি বছর যে কর দিতে হয়, সাধারণ মানুষ তাকে খাজনা বলেন। আইনের ভাষায় এর নাম ভূমি উন্নয়ন কর। কৃষি, আবাসিক, বাণিজ্যিক বা শিল্প, যে কাজেই জমি ব্যবহার হোক, মালিককে নির্ধারিত হারে এই কর দিতে হয়, যদি না আইনে মওকুফের সুযোগ থাকে।
খাজনা নিয়মিত দেওয়া শুধু আইন মানার বিষয় নয়, জমির মালিকানা প্রমাণেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হালনাগাদ দাখিলা থাকলে জমি বিক্রি, নামজারি (mutation), ব্যাংক ঋণ কিংবা মামলার সময় মালিকানার দাবি অনেক শক্ত হয়।
আইনি ভিত্তি: ভূমি উন্নয়ন কর আইন ২০২৩
২০২৩ সালে সংসদ ভূমি উন্নয়ন কর আইন ২০২৩ (২০২৩ সনের ৩১ নং আইন) পাস করে, যা ভূমি উন্নয়ন কর অধ্যাদেশ ১৯৭৬ বাতিল করেছে। নতুন আইন অনলাইনে পরিশোধকে মূল পদ্ধতি করেছে, কর বছর বদলেছে এবং কৃষিজমির মওকুফের নিয়ম স্পষ্ট করেছে। আইনটি খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় প্রযোজ্য নয়; সেখানে আলাদা ব্যবস্থা চলে।
কর বছর এখন অর্থবছর
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী ১ জুলাই ২০২৪ থেকে খাজনা আদায়ের সময়কাল প্রতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন। আগে বাংলা সন (বৈশাখ থেকে চৈত্র) অনুযায়ী হিসাব হতো। তাই পুরনো দাখিলায় বাংলা সন আর নতুন দাখিলায় অর্থবছর দেখলে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই; রূপান্তরের সময়ের হিসাব পোর্টাল নিজেই করে দেয়।
কারা খাজনা দেবেন, কারা মওকুফ পাবেন
যার নামে জমির মালিকানা রেকর্ড আছে বা যিনি জমির দখলদার মালিক, তিনিই ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়ার জন্য দায়ী। যৌথ মালিকানায় প্রত্যেক অংশীদার নিজ অংশের দায় বহন করেন, যদিও বাস্তবে একই খতিয়ানের খাজনা একসঙ্গে দেওয়া হয়।
২৫ বিঘার মওকুফ
আইন অনুযায়ী কৃষিনির্ভর কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের মোট কৃষিজমি ২৫ বিঘা (প্রায় ৮.২৫ একর) পর্যন্ত হলে কৃষিজমির খাজনা দিতে হয় না। আখ ও লবণ চাষের জমি এবং কৃষকের পুকুরও (বাণিজ্যিক মৎস্য চাষ ছাড়া) এই সুবিধার আওতায় পড়ে বলে আইন প্রণয়নের সময় জানানো হয়েছিল।
সতর্ক থাকুন: মোট কৃষিজমি ২৫ বিঘা ছাড়ালে শুধু বাড়তি অংশ নয়, পুরো কৃষিজমির ওপরই কর দিতে হয়। আর বসতবাড়ি, দোকান, কারখানা বা অন্য অকৃষি জমির কর এই মওকুফের আওতায় পড়ে না। সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকে মওকুফ দিতে পারে।
ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট মালিক
ফ্ল্যাট কিনলে আপনি জমির একটি অবিভক্ত অংশেরও মালিক হন। তাই আনুপাতিক অংশের খাজনা দেওয়ার দায় আপনার। অনেক ভবনে মালিক সমিতি একসঙ্গে খাজনা দেয়, তবে নিজের নামে নামজারি হয়ে থাকলে নিজের হোল্ডিং থেকে দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।

করের হার কীভাবে নির্ধারিত হয়
ভূমি উন্নয়ন কর জমির ধরন, ব্যবহার ও অবস্থান অনুযায়ী আলাদা হারে বসে। সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে হার নির্ধারণ ও পরিবর্তন করে, তাই নির্দিষ্ট অঙ্ক এখানে দেওয়া হলো না। আপনার হোল্ডিংয়ের প্রকৃত দাবি পোর্টালে হোল্ডিং যুক্ত করলেই দেখা যায়।
| জমির ধরন | যা বিবেচনা করা হয় | মনে রাখার বিষয় |
|---|---|---|
| কৃষিজমি | পরিবারের মোট কৃষিজমির পরিমাণ | ২৫ বিঘা পর্যন্ত মওকুফ; বেশি হলে পুরো জমিতে কর |
| আবাসিক জমি | এলাকার শ্রেণি (মহানগর, পৌরসভা, ইউনিয়ন) | শহরের জমিতে হার সাধারণত বেশি |
| বাণিজ্যিক জমি | দোকান, অফিস, মার্কেট ইত্যাদি ব্যবহার | আবাসিকের চেয়ে বেশি হার প্রযোজ্য |
| শিল্প জমি | কারখানা ও শিল্প স্থাপনা | ব্যবহার বদলালে শ্রেণি পরিবর্তন জরুরি |
| সিকস্তি জমি | নদীভাঙনে বিলীন জমি | হার পুনর্নির্ধারণের আবেদন করা যায় |
জমির ব্যবহার বদলে গেলে, যেমন কৃষিজমিতে বাড়ি বা দোকান উঠলে, হোল্ডিংয়ের শ্রেণি হালনাগাদ করা জরুরি। ভুল শ্রেণিতে খাজনা দিলে পরে বকেয়া দাবি ও সুদ আসতে পারে।
অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়ার আগে যা প্রস্তুত রাখবেন
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমিসেবা প্ল্যাটফর্মে (land.gov.bd) এখন খাজনা দেওয়ার ব্যবস্থা যুক্ত আছে। আগে ldtax.gov.bd ঠিকানা ও ভূমি উন্নয়ন কর অ্যাপ ব্যবহার হতো; বর্তমানে কোন ঠিকানা সক্রিয়, তা মন্ত্রণালয়ের পোর্টাল থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন। শুরু করার আগে হাতের কাছে রাখুন:
- জাতীয় পরিচয়পত্র। মালিকের নিজের এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ।
- সচল মোবাইল নম্বর। ওটিপি ও বার্তা আসবে এই নম্বরে।
- খতিয়ানের তথ্য। জেলা, উপজেলা, মৌজা, খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বর।
- আগের দাখিলা। থাকলে হোল্ডিং নম্বর মেলাতে সুবিধা হয়।
- নামজারির কাগজ। ক্রয় বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি হলে নামজারি খতিয়ান।
খতিয়ানে আপনার নাম না থাকলে সাধারণত নিজের নামে হোল্ডিং খোলা যায় না। আগে নামজারি করুন। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সব ওয়ারিশের নামে একটি খতিয়ানে যৌথ নামজারি হয়; আলাদা খতিয়ান পেতে নিবন্ধিত বণ্টননামা লাগে।
ধাপে ধাপে অনলাইনে খাজনা পরিশোধ
নিচের ধাপগুলো একবার শেষ করলে পরের বছরগুলোতে শুধু লগইন করে কয়েক মিনিটেই ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া যায়।
- নিবন্ধন করুন। ভূমিসেবা পোর্টালে নাগরিক হিসেবে নিবন্ধন করুন। নাম, মোবাইল নম্বর, এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ দিন; মোবাইলে আসা ওটিপি দিয়ে নিশ্চিত করুন। নিবন্ধন একবারই করতে হয়।
- লগইন করুন। মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে নিজের অ্যাকাউন্টে ঢুকে খাজনা পরিশোধের সেবাটি বেছে নিন।
- হোল্ডিং যুক্ত করুন। তালিকায় আপনার হোল্ডিং না থাকলে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা, খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বর দিয়ে নতুন খতিয়ান যুক্ত করার আবেদন করুন।
- যাচাইয়ের অপেক্ষা করুন। ইউনিয়ন বা পৌর ভূমি অফিস রেকর্ড মিলিয়ে হোল্ডিং অনুমোদন করে। অনুমোদন হলে তা আপনার হোল্ডিং তালিকায় দেখা যাবে।
- দাবি দেখুন। হোল্ডিং বেছে নিলে বকেয়া, সুদ ও চলতি বছরের খাজনার হিসাব আসবে। কোন বছরের টাকা দেবেন তা নির্বাচন করুন।
- টাকা পরিশোধ করুন। বিকাশ, নগদ, রকেট, ব্যাংক কার্ড বা সোনালী ব্যাংকের পেমেন্ট গেটওয়ের মতো উপলব্ধ যেকোনো পদ্ধতিতে পরিশোধ করুন।
- দাখিলা সংগ্রহ করুন। পরিশোধ সফল হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাখিলা তৈরি হয়। ডাউনলোড করে প্রিন্ট নিন এবং ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করুন।
কম্পিউটার বা স্মার্টফোন না থাকলে
নিজে অনলাইনে কাজ করতে না পারলে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে এনআইডি, জন্মতারিখ ও খতিয়ান নম্বর নিয়ে গেলে উদ্যোক্তারা নিবন্ধন ও পরিশোধে সাহায্য করেন। ইউনিয়ন ভূমি অফিসেও সহকারী ভূমি কর্মকর্তা অনলাইনে তথ্য প্রবেশ করিয়ে দিতে পারেন। সমস্যায় পড়লে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কল সেন্টার ১৬১২২ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
পুরনো হাতে লেখা দাখিলা
অনলাইন ব্যবস্থা চালুর আগের বছরগুলোর হাতে লেখা দাখিলা ফেলে দেবেন না। মালিকানা ও দখলের ধারাবাহিকতা প্রমাণে পুরনো রসিদ এখনো মূল্যবান, বিশেষ করে উত্তরাধিকার বা সীমানা বিরোধে। এগুলো স্ক্যান করে ডিজিটাল কপি রাখুন এবং মূল কপি নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষণ করুন।
লেনদেনের সময় সতর্কতা
শুধু সরকারি পোর্টাল বা অ্যাপ ব্যবহার করুন। কেউ ফোন করে খাজনার নামে ব্যক্তিগত নম্বরে টাকা পাঠাতে বললে সেটা প্রতারণা হতে পারে। পেমেন্ট সফল হলেও দাখিলা না এলে লেনদেন নম্বর সংরক্ষণ করে পোর্টালের অভিযোগ ব্যবস্থায় বা কল সেন্টারে জানান।
অনলাইনে সাধারণ কারিগরি সমস্যা ও সমাধান
অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে গিয়ে কিছু সমস্যা প্রায়ই দেখা যায়। বেশিরভাগই সহজে সমাধানযোগ্য, যদি কারণটা বোঝা যায়।
| সমস্যা | সম্ভাব্য কারণ | করণীয় |
|---|---|---|
| ওটিপি আসছে না | নেটওয়ার্ক সমস্যা বা ভুল নম্বর | কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন; নম্বরটি নিজের নামে নিবন্ধিত কিনা দেখুন |
| এনআইডি যাচাই হচ্ছে না | জন্মতারিখ বা নামের বানানে অমিল | এনআইডি কার্ডের তথ্য হুবহু লিখুন; এনআইডিতে ভুল থাকলে আগে তা সংশোধন করুন |
| হোল্ডিং খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না | খতিয়ান এখনো অনলাইনে যুক্ত হয়নি বা নামজারি হয়নি | নতুন খতিয়ান যুক্তের আবেদন দিন; প্রয়োজনে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন |
| টাকা কেটেছে, দাখিলা আসেনি | পেমেন্ট গেটওয়ের সঙ্গে সমন্বয়ে দেরি | লেনদেন নম্বর রেখে কিছু সময় অপেক্ষা করুন; না এলে কল সেন্টারে অভিযোগ দিন |
| দাবির অঙ্ক অস্বাভাবিক | ভুল শ্রেণি, ভুল পরিমাণ বা পুরনো বকেয়া | পরিশোধের আগে ভূমি অফিসে হিসাব যাচাই ও সংশোধনের আবেদন করুন |
যেকোনো অভিযোগ করার সময় নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর, হোল্ডিং নম্বর, লেনদেন নম্বর ও স্ক্রিনশট হাতের কাছে রাখুন। এতে সমাধান দ্রুত হয় এবং পরে প্রমাণ হিসেবেও কাজে লাগে।
দাখিলা: যাচাই, সংরক্ষণ ও ব্যবহার
দাখিলা হলো ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের সরকারি রসিদ। অনলাইনে দেওয়া দাখিলায় কিউআর কোড থাকে, যা স্ক্যান করলে পোর্টালে রসিদের তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়। ফলে হাতে লেখা পুরনো দাখিলার মতো জাল রসিদের ঝুঁকি অনেক কমে গেছে।
কোথায় দাখিলা লাগে
- দলিল নিবন্ধন। জমি বিক্রি বা দানের দলিল নিবন্ধনের সময় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাধারণত হালনাগাদ খাজনার দাখিলা দেখাতে হয়।
- নামজারি। নামজারির আবেদনে এবং শুনানিতে খাজনার হালনাগাদ রসিদ প্রমাণ হিসেবে কাজে আসে।
- ব্যাংক ঋণ। জমি বন্ধক রেখে ঋণ নিতে ব্যাংক হালনাগাদ দাখিলা চায়।
- মামলা ও বিরোধ। দখল ও মালিকানার বিরোধে নিয়মিত খাজনা পরিশোধ গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক প্রমাণ।
জমি কেনার আগে বিক্রেতার দাখিলা অবশ্যই যাচাই করুন। দাখিলায় খতিয়ান, দাগ ও মালিকের নাম আপনার কেনা জমির সঙ্গে মেলে কিনা দেখুন। কেনাকাটার পুরো প্রক্রিয়া জানতে আমাদের জমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার গাইড দেখতে পারেন।
বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর, সুদ ও সার্টিফিকেট মামলা
ভূমি উন্নয়ন কর সময়মতো না দিলে তা বকেয়া হিসেবে জমতে থাকে। আইন অনুযায়ী বকেয়ার ওপর বার্ষিক ৬.২৫ শতাংশ হারে সুদ বা জরিমানা যোগ হয়। পোর্টালে দাবি দেখলে বকেয়া বছরগুলো ও সুদের অঙ্ক আলাদাভাবে দেখা যায়।
টানা তিন বছর খাজনা বকেয়া থাকলে সরকার সার্টিফিকেট মামলার মাধ্যমে তা আদায় করতে পারে। সার্টিফিকেট মামলা চলে সরকারি পাওনা আদায় আইন ১৯১৩ (Public Demands Recovery Act) অনুযায়ী, যেখানে শেষ পর্যন্ত জমি ক্রোক ও নিলামের ঝুঁকিও থাকে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের সরকারি পাওনা আদায় আইনের গাইড পড়ুন।
বকেয়া পরিশোধের কৌশল
বকেয়া থাকলে দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধ করুন, কারণ প্রতি বছর সুদ বাড়ে। দাবির অঙ্ক বেশি মনে হলে আগে হোল্ডিংয়ের শ্রেণি ও জমির পরিমাণ ঠিক আছে কিনা মিলিয়ে দেখুন। ভুল থাকলে সংশোধনের আবেদন করে তারপর পরিশোধ করাই ভালো, তবে দেরির কারণে যেন নতুন বছরের সুদ না জমে সেদিকে খেয়াল রাখুন।
দাবিতে ভুল বা হোল্ডিং সমস্যা হলে করণীয়
অনলাইন ব্যবস্থাতেও ভুল হতে পারে: পুরনো রেকর্ড থেকে ভুল জমির পরিমাণ, ভুল শ্রেণি, অন্যের অংশ আপনার হোল্ডিংয়ে যোগ হওয়া, বা আপনার জমি অন্য হোল্ডিংয়ে চলে যাওয়া। এমন হলে নিচের পথগুলো খোলা আছে।
আপত্তি ও সংশোধন
ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (তহসিলদার) প্রত্যেক মালিকের দেয় করের তালিকা তৈরি করে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে পাঠান। দাবির অঙ্ক নিয়ে আপত্তি থাকলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা জেলা প্রশাসকের কাছে আপত্তি জানানো যায়; আইন প্রণয়নের সময় জানানো হয়েছিল যে আপত্তি ১৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। আপত্তির সঙ্গে খতিয়ান, নামজারির কাগজ ও আগের দাখিলা জমা দিন।
নদীভাঙন ও সিকস্তি জমি
নদীভাঙনে জমি বিলীন হলে সিকস্তি হিসেবে করের হার পুনর্নির্ধারণের আবেদন করা যায়। ভূমি অফিস সরেজমিন তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেয়। আবেদন না করলে বিলীন জমির খাজনাও বকেয়া হিসেবে জমতে থাকে।
রেকর্ড ভুল হলে
খতিয়ানেই ভুল থাকলে শুধু খাজনার আবেদনে তা ঠিক হয় না। রেকর্ড সংশোধন, নামজারি বা প্রয়োজনে দেওয়ানি আদালতে প্রতিকার নিতে হতে পারে। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ জাল কাগজ ও অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সুরক্ষা দিয়েছে।

জমি কেনার আগে খাজনার কাগজ যাচাই
জমি বা ফ্ল্যাট কেনার সময় অনেক ক্রেতা দলিল ও খতিয়ান দেখেন, কিন্তু খাজনার অবস্থা ভালো করে যাচাই করেন না। অথচ বিক্রেতার বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর জমির সঙ্গেই থেকে যায়, এবং নামজারির পর সেই বকেয়া ও সুদের দাবি নতুন মালিকের ঘাড়ে আসতে পারে।
যাচাইয়ের তালিকা
- সর্বশেষ দাখিলা। বিক্রেতার কাছ থেকে চলতি অর্থবছর পর্যন্ত পরিশোধের কিউআর কোডযুক্ত দাখিলা চেয়ে নিন এবং কোড স্ক্যান করে মিলিয়ে দেখুন।
- খতিয়ানের সঙ্গে মিল। দাখিলার মৌজা, খতিয়ান, দাগ ও জমির পরিমাণ বিক্রয় দলিলের তফসিলের সঙ্গে মেলে কিনা দেখুন।
- শ্রেণি ঠিক আছে কিনা। বাড়ি বা দোকান থাকা জমিতে কৃষি হারে খাজনা দেওয়া হয়ে থাকলে ভবিষ্যতে বাড়তি দাবি আসতে পারে।
- বকেয়া নিষ্পত্তি। বকেয়া থাকলে দলিল নিবন্ধনের আগেই বিক্রেতাকে দিয়ে তা পরিশোধ করিয়ে নিন, অথবা চুক্তিতে স্পষ্ট লিখুন কে কতটুকু বহন করবেন।
রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ধারা ৫২ক অনুযায়ী বিক্রেতার নাম সর্বশেষ খতিয়ানে (উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে নামজারি খতিয়ানে) না থাকলে বিক্রয় দলিল নিবন্ধন হয় না। খতিয়ান ও দাখিলা একসঙ্গে যাচাই করলে দুই দিকের ঝুঁকিই কমে। বাড়ি কেনার পুরো আইনি প্রস্তুতি জানতে আমাদের বাড়ি কেনার আইনি গাইড দেখুন।
খাজনা, পৌরকর ও অন্যান্য কর: পার্থক্য বুঝুন
অনেকে খাজনা আর পৌরকরকে একই মনে করেন। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা কর, আলাদা প্রতিষ্ঠান আদায় করে, এবং একটির রসিদ অন্যটির বিকল্প নয়।
- ভূমি উন্নয়ন কর। জমির জন্য সরকারকে দেওয়া বার্ষিক কর; আদায় করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি অফিস, ভূমি উন্নয়ন কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী।
- পৌরকর বা হোল্ডিং ট্যাক্স। সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা এলাকায় ভবন ও স্থাপনার জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া কর।
- নিবন্ধনের সময়ের কর ও ফি। জমি কেনাবেচায় স্ট্যাম্প শুল্ক, নিবন্ধন ফি, স্থানীয় সরকার কর ও আয়করের মতো এককালীন খরচ, যা বার্ষিক খাজনা থেকে আলাদা।
- আয়কর। জমি থেকে ভাড়া বা বিক্রয় থেকে লাভ হলে আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী আলাদা দায় তৈরি হতে পারে।
শহরের একটি বাড়ির মালিককে তাই সাধারণত দুটি বার্ষিক রসিদ রাখতে হয়: ভূমি অফিসের দাখিলা এবং সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ। দুটিই আলাদাভাবে হালনাগাদ রাখুন।
কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের জমির খাজনা
কোম্পানি, এনজিও, ট্রাস্ট বা অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা জমির ক্ষেত্রেও ভূমি উন্নয়ন কর একই আইনে প্রযোজ্য। এসব জমি সাধারণত বাণিজ্যিক বা শিল্প শ্রেণিতে পড়ে, তাই করের দায় ব্যক্তিগত কৃষিজমির চেয়ে বেশি এবং ২৫ বিঘার মওকুফ প্রযোজ্য হয় না।
প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দাখিলা শুধু ভূমি অফিসের বিষয় নয়। ব্যাংক ঋণ নবায়ন, নিরীক্ষা, বিনিয়োগকারীর ডিউ ডিলিজেন্স এবং কারখানা বা অফিসের লাইসেন্স নবায়নের সময়ও হালনাগাদ খাজনার প্রমাণ চাওয়া হতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠানের নামে একটি কেন্দ্রীয় অ্যাকাউন্ট খুলে সব হোল্ডিং একসঙ্গে পরিচালনা করা এবং প্রতি অর্থবছরের শুরুতে পরিশোধের তারিখ ক্যালেন্ডারে রাখা ভালো।
অর্থনৈতিক অঞ্চল বা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে ইজারা নেওয়া জমির ক্ষেত্রে খাজনা ও অন্যান্য চার্জের দায় সাধারণত ইজারা চুক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত হয়। চুক্তিটি ভালো করে পড়ে দায় নিশ্চিত হয়ে নিন।
প্রবাসী ও দূরে থাকা জমির মালিকদের জন্য
অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়ার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা পেয়েছেন প্রবাসীরা। এনআইডি ও বাংলাদেশি মোবাইল নম্বর সচল থাকলে বিদেশ থেকেই নিবন্ধন করে খাজনা দেওয়া যায়। বিদেশ থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কল সেন্টারে +৮৮০ ৯৬১২৩ ১৬১২২ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
নিজে না পারলে দেশে থাকা আত্মীয় বা আইনজীবীকে দিয়ে কাজ করানো যায়। তবে জমি বিক্রি, বন্ধক বা মামলা পরিচালনার মতো কাজে বিদেশে করা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি লাগবে, যা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২ ও বিধিমালা ২০১৫ অনুযায়ী দেশে আসার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রত্যয়ন করাতে হয়। বিস্তারিত জানতে আমাদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি গাইড দেখুন।
যেসব ভুল সবচেয়ে বেশি হয়
- বছরের পর বছর না দেওয়া। সুদ জমে বড় অঙ্ক হয় এবং সার্টিফিকেট মামলার ঝুঁকি তৈরি হয়।
- নামজারি ছাড়া খাজনা। পুরনো মালিকের নামে খাজনা দিলে মালিকানা প্রমাণে তা দুর্বল সহায়তা দেয়।
- ভুল শ্রেণি। বাণিজ্যিক ব্যবহারের জমিতে কৃষি হারে খাজনা দিলে পরে বকেয়া দাবি আসতে পারে।
- দাখিলা হারানো। ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ না করলে জরুরি সময়ে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।
- দালালের হাতে টাকা। অনলাইনে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে পরিশোধ করলে প্রতারণার সুযোগ থাকে না।
ভূমি উন্নয়ন কর নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
খাজনা কি এখন শুধু অনলাইনেই দেওয়া যায়?
আইন ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী অনলাইন এখন মূল পদ্ধতি। নিজে না পারলে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহায়তায় অনলাইনেই পরিশোধ করা যায়।
কোন সময়ের মধ্যে খাজনা দিতে হয়?
১ জুলাই ২০২৪ থেকে কর বছর ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন। চলতি বছরের খাজনা ৩০ জুনের মধ্যে দিলে বকেয়া ও সুদের ঝামেলা এড়ানো যায়।
আমার কৃষিজমি ২০ বিঘা, খাজনা দিতে হবে কি?
আপনি কৃষিনির্ভর হলে এবং পরিবারের মোট কৃষিজমি ২৫ বিঘার মধ্যে থাকলে কৃষিজমির খাজনা মওকুফ। তবে বসতভিটা বা অন্য অকৃষি জমির কর দিতে হবে।
অনলাইনের দাখিলা কি আইনত গ্রহণযোগ্য?
হ্যাঁ। পোর্টাল থেকে পাওয়া কিউআর কোডযুক্ত দাখিলা সরকারি রসিদ, এবং কিউআর কোড স্ক্যান করে যে কেউ এর সত্যতা যাচাই করতে পারেন।
হোল্ডিং অনুমোদন হচ্ছে না, কী করব?
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌর ভূমি অফিসে খতিয়ান ও নামজারির কাগজ নিয়ে যোগাযোগ করুন। রেকর্ডে নাম না থাকলে আগে নামজারি করতে হবে।
বকেয়া থাকলে কি জমি নিলাম হতে পারে?
দীর্ঘদিন বকেয়া থাকলে সার্টিফিকেট মামলা হতে পারে, এবং সেই মামলায় শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি ক্রোক ও নিলামের ঝুঁকি থাকে। তাই বকেয়া দ্রুত পরিশোধ করাই নিরাপদ।
আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি
আমরা জমির মালিক, ক্রেতা ও প্রবাসীদের জন্য খতিয়ান ও দাখিলা যাচাই, নামজারি, হোল্ডিং সংশোধন, বকেয়া খাজনা ও সার্টিফিকেট মামলা এবং জমি কেনাবেচার আইনি দিক দেখাশোনা করি। বিস্তারিত জানুন আমাদের রিয়েল এস্টেট ও ভূমি আইন প্র্যাকটিস পাতায়।
খাজনা, দাখিলা বা জমির কাগজ নিয়ে সমস্যা?
আমরা আপনার খতিয়ান, হোল্ডিং ও দাখিলা যাচাই করে সমস্যার সমাধানের পথ ঠিক করে দিই।
পরামর্শ বুক করুনভূমি আইন প্র্যাকটিসপ্রাথমিক সূত্র: ভূমি উন্নয়ন কর আইন ২০২৩, বাংলাদেশের আইন পোর্টাল; ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমিসেবা পোর্টাল; অনলাইন খাজনা ব্যবস্থা ldtax.gov.bd।
এই লেখা ২০২৬ সালের বাংলাদেশের আইন সম্পর্কে সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। করের হার, পোর্টাল ও প্রক্রিয়া সময়ের সঙ্গে বদলায়; কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভূমি অফিস বা একজন যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করুন।



0 Comments