Meheruba Mahbub — Global Header Mega Menu

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন: 7টি জরুরি নিয়মে ফারায়েজ অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন 2026

by Barrister Meheruba Mahbub | Nov 7, 2026 | Bangladesh Law, Inheritance Law | 0 comments

বাংলাদেশে একজন মুসলিম মারা গেলে তার জমি, বাড়ি, টাকা ও অন্যান্য সম্পত্তি কে কতটুকু পাবেন, তা নির্ধারণ করে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন, যা প্রচলিতভাবে ফারায়েজ নামে পরিচিত। এই আইনে স্বামী, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, বাবা-মাসহ প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অংশ নির্দিষ্ট। তবু বাস্তবে অংশ নিয়ে ভুল ধারণা, নারীদের বঞ্চিত করা এবং ভাইবোনের মধ্যে বিরোধ প্রায়ই দেখা যায়। এই লেখায় সহজ ভাষায় নিয়ম, হিসাবের উদাহরণ ও আইনি প্রক্রিয়া তুলে ধরা হলো।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন ফারায়েজ গাইড
এই লেখায় যা আছে
মূল বিষয়গুলো
  • মুসলিম উত্তরাধিকার আইন মূলত কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহভিত্তিক, যা বাংলাদেশের আদালত প্রয়োগ করেন।
  • সম্পত্তি বণ্টনের আগে দাফন খরচ, ঋণ (স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহরসহ) এবং বৈধ ওসিয়ত পরিশোধ করতে হয়।
  • ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পায়; স্ত্রী সন্তান থাকলে এক-অষ্টমাংশ এবং স্বামী সন্তান থাকলে এক-চতুর্থাংশ পান।
  • মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ৪ ধারা অনুযায়ী বাবা বা মায়ের আগে মারা যাওয়া সন্তানের সন্তানরা (এতিম নাতি-নাতনি) সেই অংশ পান।
  • ওয়ারিশ সনদ, বণ্টননামা নিবন্ধন ও নামজারির মাধ্যমে উত্তরাধিকারীরা আইনত মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেন।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের উৎস

বাংলাদেশে মুসলিমদের উত্তরাধিকার তাদের ব্যক্তিগত আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন ১৯৩৭ অনুযায়ী উত্তরাধিকারসহ পারিবারিক বিষয়ে মুসলিমদের ক্ষেত্রে শরিয়ত প্রযোজ্য। দেশের অধিকাংশ মুসলিম হানাফি মাজহাব অনুসরণ করেন, তাই আদালত সাধারণত হানাফি ফিকহের নিয়ম প্রয়োগ করেন। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এতিম নাতি-নাতনির উত্তরাধিকারের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন এনেছে।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী মৃত্যুর মুহূর্তে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারীদের অধিকার জন্মায়। কোনো উত্তরাধিকারীকে পরিবারের অন্য সদস্যরা ইচ্ছেমতো বঞ্চিত করতে পারেন না। জমি নামজারি বা দলিল না হলেও উত্তরাধিকারীর অধিকার আইনত বহাল থাকে।

বণ্টনের আগে যা পরিশোধ করতে হয়

উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করার আগে কয়েকটি দায় ক্রমানুসারে পরিশোধ করতে হয়:

  1. দাফন-কাফন। মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের যুক্তিসঙ্গত খরচ।
  2. ঋণ। মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ঋণ, যার মধ্যে স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহরও অন্তর্ভুক্ত।
  3. ওসিয়ত। অবশিষ্ট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বৈধ ওসিয়ত।
  4. ওয়ারিশ নির্ধারণ। জীবিত উত্তরাধিকারীদের তালিকা তৈরি ও ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ।
  5. অংশ নির্ধারণ। ফারায়েজের নিয়মে প্রত্যেকের অংশ হিসাব।
  6. বণ্টননামা। সব উত্তরাধিকারীর সম্মতিতে বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন।
  7. নামজারি। প্রত্যেকের অংশ অনুযায়ী নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর হালনাগাদ।

স্ত্রীর দেনমোহর একটি ঋণ, তাই বিধবা স্ত্রী প্রথমে দেনমোহর এবং তারপর উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজের অংশ পান। এই দুটি আলাদা অধিকার।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বণ্টনের ধাপ
মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের সাধারণ ক্রম

প্রধান উত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত অংশ

উত্তরাধিকারীসন্তান থাকলেসন্তান না থাকলে
স্বামীএক-চতুর্থাংশ (১/৪)অর্ধেক (১/২)
স্ত্রী (এক বা একাধিক মিলে)এক-অষ্টমাংশ (১/৮)এক-চতুর্থাংশ (১/৪)
মাএক-ষষ্ঠাংশ (১/৬)এক-তৃতীয়াংশ (১/৩), তবে একাধিক ভাইবোন থাকলে ১/৬
বাবাএক-ষষ্ঠাংশ (১/৬), ছেলে না থাকলে অবশিষ্টাংশওঅবশিষ্টাংশভোগী হিসেবে
একমাত্র মেয়ে (ছেলে না থাকলে)অর্ধেক (১/২)
একাধিক মেয়ে (ছেলে না থাকলে)মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩)
ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গেঅবশিষ্টাংশ, ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ হারে

এখানে "সন্তান" বলতে ছেলে বা মেয়ে, এবং কিছু ক্ষেত্রে ছেলের সন্তানও বোঝায়। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনেক জটিল এবং প্রতিটি পরিবারের পরিস্থিতি আলাদা, তাই নির্দিষ্ট ঘটনায় অংশ হিসাবের জন্য অভিজ্ঞ আইনজীবী বা আলেমের সহায়তা নেওয়া উচিত।

অংশীদার ও অবশিষ্টাংশভোগী

ফারায়েজে উত্তরাধিকারীরা প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত। "যাবিল ফুরুজ" বা নির্দিষ্ট অংশীদাররা কুরআনে নির্ধারিত অংশ পান, যেমন স্বামী, স্ত্রী, মা, বাবা, মেয়ে। "আসাবা" বা অবশিষ্টাংশভোগীরা নির্দিষ্ট অংশীদারদের অংশ দেওয়ার পর যা থাকে তা পান, যেমন ছেলে, ছেলে থাকলে মেয়েরাও তার সঙ্গে, এবং ছেলে না থাকলে বাবা বা ভাই। এই দুই শ্রেণির উত্তরাধিকারী না থাকলে দূরবর্তী আত্মীয়রা, যাদের "যাবিল আরহাম" বলা হয়, উত্তরাধিকারী হন।

একটি হিসাবের উদাহরণ

ধরা যাক, রহিম সাহেব মারা গেলেন এবং রেখে গেলেন স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে, আর তার বাবা-মা আগেই মারা গেছেন। দাফন খরচ, ঋণ ও স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পত্তি ধরা যাক ৮০ লাখ টাকা মূল্যের। সন্তান থাকায় স্ত্রী পাবেন এক-অষ্টমাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা। বাকি ৭০ লাখ টাকা দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে ২:২:১ অনুপাতে ভাগ হবে, অর্থাৎ প্রত্যেক ছেলে ২৮ লাখ এবং মেয়ে ১৪ লাখ টাকা। এই উদাহরণটি সরলীকৃত, তবে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে সাহায্য করে।

গুরুত্বপূর্ণ টিপস

বাবা-মা জীবিত থাকলে, শুধু মেয়ে থাকলে, বা সন্তান না থাকলে হিসাব সম্পূর্ণ বদলে যায়। "আউল" ও "রাদ" এর মতো বিশেষ নিয়মও প্রযোজ্য হতে পারে। তাই নিজের পরিবারের ক্ষেত্রে আন্দাজে ভাগ না করে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।

এতিম নাতি-নাতনির অধিকার

প্রচলিত ফিকহে দাদা বা নানার আগে বাবা বা মা মারা গেলে নাতি-নাতনিরা অনেক ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ৪ ধারা এই অবিচার দূর করেছে। এই ধারা অনুযায়ী উত্তরাধিকার উন্মুক্ত হওয়ার আগে কোনো ছেলে বা মেয়ে মারা গেলে, তার সন্তানরা প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সেই অংশ পাবেন, যা তাদের বাবা বা মা জীবিত থাকলে পেতেন। বাংলাদেশের মুসলিম উত্তরাধিকার আইন এই বিধিবদ্ধ সংশোধন অনুযায়ী প্রয়োগ হয়।

ওসিয়তের নিয়ম

একজন মুসলিম তার সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ ওসিয়ত বা উইলের মাধ্যমে দিতে পারেন। উত্তরাধিকারীর অনুকূলে ওসিয়ত অন্য উত্তরাধিকারীদের সম্মতি ছাড়া কার্যকর হয় না, এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি ওসিয়তও উত্তরাধিকারীদের সম্মতি লাগে। ওসিয়ত মৌখিক বা লিখিত হতে পারে, তবে বিরোধ এড়াতে লিখিত ও সাক্ষীসহ করা এবং সম্ভব হলে নিবন্ধন করা ভালো। জীবদ্দশায় হেবা বা দানের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর আলাদা বিষয় এবং এর নিজস্ব শর্ত আছে।

ওয়ারিশ সনদ ও উত্তরাধিকার সনদ

উত্তরাধিকারীদের তালিকা প্রমাণ করতে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করতে হয়। জমির নামজারি ও অনেক প্রশাসনিক কাজে এই সনদ লাগে। ব্যাংকের টাকা, শেয়ার বা সঞ্চয়পত্র তুলতে অনেক ক্ষেত্রে আদালত থেকে উত্তরাধিকার সনদ (সাকসেশন সার্টিফিকেট) নিতে হয়। বিস্তারিত জানতে আমাদের ওয়ারিশ সনদ বিষয়ক লেখা পড়ুন।

ছেলে না থাকলে কী হয়

অনেক পরিবারে শুধু মেয়ে সন্তান থাকে, এবং তখন সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী ছেলে না থাকলে একমাত্র মেয়ে অর্ধেক এবং একাধিক মেয়ে মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ পান। বাকি অংশ নির্দিষ্ট অংশীদারদের, যেমন স্ত্রী ও বাবা-মা, দেওয়ার পর অবশিষ্টাংশভোগীদের কাছে যায়, যা প্রায়ই মৃত ব্যক্তির বাবা, ভাই বা ভাইয়ের ছেলেরা পান। কোনো অবশিষ্টাংশভোগী না থাকলে "রাদ" নীতিতে অবশিষ্ট অংশ আবার নির্দিষ্ট অংশীদারদের মধ্যে, সাধারণত স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া, আনুপাতিকভাবে ফেরত দেওয়া হয়।

এই নিয়মের কারণে অনেক বাবা-মা জীবদ্দশায় মেয়েদের নামে হেবা বা দানপত্রের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর করেন। হেবা বৈধ হতে ঘোষণা, গ্রহণ ও দখল হস্তান্তর লাগে, এবং স্থাবর সম্পত্তির হেবা নিবন্ধন করতে হয়। এ ধরনের পরিকল্পনা করার আগে আইনি ও ধর্মীয় দিক বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

সন্তান না থাকলে স্বামী-স্ত্রীর অংশ

নিঃসন্তান দম্পতির ক্ষেত্রে স্বামী মারা গেলে স্ত্রী এক-চতুর্থাংশ পান, আর স্ত্রী মারা গেলে স্বামী অর্ধেক পান। বাকি অংশ মৃত ব্যক্তির বাবা-মা, ভাইবোন বা অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বণ্টিত হয়। অনেক নিঃসন্তান দম্পতি জীবনসঙ্গীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য জীবদ্দশায় হেবা বা যৌথ মালিকানার ব্যবস্থা করেন, যাতে মৃত্যুর পর জীবনসঙ্গী আর্থিক সংকটে না পড়েন।

ভাইবোন কখন উত্তরাধিকারী হন

মৃত ব্যক্তির ছেলে, ছেলের ছেলে বা বাবা জীবিত থাকলে ভাইবোনেরা সাধারণত উত্তরাধিকার পান না। এদের কেউ না থাকলে আপন ভাইবোন, বৈমাত্রেয় ভাইবোন এবং বৈপিত্রেয় ভাইবোন বিভিন্ন নিয়মে অংশ পান। বৈপিত্রেয় ভাইবোনেরা নির্দিষ্ট অংশ পান, আর আপন ভাই অবশিষ্টাংশভোগী হন, যেখানে ভাই বোনের দ্বিগুণ পান। এই নিয়মগুলো জটিল, তাই ভাইবোনের অংশ জড়িত থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের হিসাব নিন।

বণ্টননামা দলিল কেন জরুরি

উত্তরাধিকারীরা মৌখিকভাবে সম্পত্তি ভাগ করে নিলেও আইনগতভাবে প্রত্যেকের নিজ অংশের ওপর একক মালিকানা প্রতিষ্ঠায় বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন করা সবচেয়ে নিরাপদ। বণ্টননামায় প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর নাম, অংশ, জমির দাগ ও খতিয়ান নম্বর এবং চৌহদ্দি উল্লেখ থাকে, এবং সব উত্তরাধিকারী স্বাক্ষর করেন। নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে নামজারি করলে ভবিষ্যতে বিক্রি, বন্ধক বা উন্নয়নে জটিলতা কমে। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী অংশ ঠিক রেখে বণ্টননামা করলে বিরোধের সম্ভাবনাও কমে যায়।

নারীদের বঞ্চিত করার প্রবণতা ও প্রতিকার

বাস্তবে অনেক পরিবারে মেয়ে, বোন বা বিধবা স্ত্রীকে নানা অজুহাতে সম্পত্তির অংশ থেকে বঞ্চিত করা হয়। কেউ চাপ দিয়ে "হক ছেড়ে দেওয়ার" দলিলে স্বাক্ষর নেন, কেউ নামজারির সময় নারীদের নাম বাদ দেন। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন নারীদের যে অংশ দিয়েছে, তা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। চাপ বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া স্বাক্ষর আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায়।

বঞ্চিত নারী প্রথমে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা বা সালিশের চেষ্টা করতে পারেন। সমাধান না হলে দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা করে নিজের অংশ আলাদা করার আদেশ চাওয়া যায়। নামজারিতে নাম বাদ পড়লে ভূমি অফিসে আপত্তি ও সংশোধনের আবেদন করা যায়। প্রমাণ হিসেবে ওয়ারিশ সনদ, খতিয়ান, দলিল ও পারিবারিক সম্পর্কের কাগজ গুরুত্বপূর্ণ।

বাটোয়ারা মামলা

উত্তরাধিকারীরা সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে যেকোনো উত্তরাধিকারী দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা করতে পারেন। আদালত প্রথমে প্রত্যেকের অংশ নির্ধারণ করে প্রাথমিক ডিক্রি দেন, তারপর প্রয়োজনে আমিন কমিশনের মাধ্যমে জমি মেপে প্রত্যেকের অংশ আলাদা করে চূড়ান্ত ডিক্রি দেন। এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হতে পারে, তাই অনেক ক্ষেত্রে মামলা চলাকালেও আপসের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী অংশ নির্ধারণে আদালত শরিয়তের নিয়ম প্রয়োগ করেন।

প্রবাসী উত্তরাধিকারী

বিদেশে থাকা উত্তরাধিকারীরাও সমান অধিকার রাখেন; দেশে না থাকার কারণে অংশ কমে না। প্রবাসী উত্তরাধিকারী পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে দেশে কাউকে প্রতিনিধি নিয়োগ করে নামজারি, বণ্টননামা বা মামলা পরিচালনা করতে পারেন। বিদেশে সম্পাদিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নোটারাইজেশন এবং অ্যাপোস্টিল বা দূতাবাসের সত্যায়নের পর দেশে স্ট্যাম্প ও প্রয়োজনে নিবন্ধন করতে হয়। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পর্কে জানতে আমাদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিষয়ক লেখা দেখুন।

ব্যাংকের টাকা, সঞ্চয়পত্র ও শেয়ার

মৃত ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র, প্রভিডেন্ট ফান্ড বা শেয়ারে নমিনি থাকলে প্রতিষ্ঠান সাধারণত নমিনিকে টাকা দেয়। তবে আদালতের নজির অনুযায়ী নমিনি অনেক ক্ষেত্রে কেবল অর্থ গ্রহণকারী ট্রাস্টি; প্রকৃত মালিকানা মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সব উত্তরাধিকারীর মধ্যে বণ্টিত হওয়া উচিত। নমিনি না থাকলে উত্তরাধিকার সনদ লাগতে পারে। এই বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্বচ্ছতা বজায় রাখলে বিরোধ এড়ানো যায়।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন মূল তথ্য
মুসলিম উত্তরাধিকারের মূল আইনি তথ্য

কারা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী কয়েকটি ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি উত্তরাধিকার পান না। যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে মৃত ব্যক্তিকে হত্যা করেছেন, তিনি তার উত্তরাধিকারী হতে পারেন না। প্রচলিত হানাফি মতে ভিন্ন ধর্মের ব্যক্তি মুসলিমের উত্তরাধিকারী হন না, যদিও এ বিষয়ে আইনি বিতর্ক ও বিভিন্ন মত আছে। অন্যদিকে দত্তক সন্তান মুসলিম আইনে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃত নয়; তবে জীবদ্দশায় হেবা বা এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওসিয়তের মাধ্যমে তাদের জন্য সম্পত্তি রাখা যায়। গর্ভস্থ সন্তান জীবিত জন্ম নিলে উত্তরাধিকারী হয়, তাই এমন ক্ষেত্রে বণ্টনের আগে সতর্ক থাকা দরকার।

আউল ও রাদ: বিশেষ হিসাবের নিয়ম

কখনো কখনো নির্দিষ্ট অংশীদারদের মোট অংশ এক-এর বেশি হয়ে যায়; তখন "আউল" নীতিতে সবার অংশ আনুপাতিকভাবে কমানো হয়। আবার নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার পর কিছু অবশিষ্ট থাকলে এবং কোনো অবশিষ্টাংশভোগী না থাকলে "রাদ" নীতিতে বাড়তি অংশ নির্দিষ্ট অংশীদারদের মধ্যে আনুপাতিকভাবে ফেরত দেওয়া হয়, সাধারণত স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া। এসব হিসাব গাণিতিকভাবে জটিল, তাই ভুল এড়াতে অভিজ্ঞ কারো সাহায্যে হিসাব করে লিখিত আকারে রাখুন।

জীবদ্দশায় পরিকল্পনা

মৃত্যুর পর বিরোধ এড়াতে অনেকে জীবদ্দশায় সম্পত্তির পরিকল্পনা করেন। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের অংশ পরিবর্তন করা যায় না, কিন্তু জীবদ্দশায় হেবা, ওয়াকফ বা এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওসিয়তের মাধ্যমে কিছু নমনীয়তা আছে। সম্পত্তির তালিকা, দলিল ও কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা, নামজারি হালনাগাদ রাখা এবং পরিবারকে বিষয়গুলো জানিয়ে রাখা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বড় উপকার। যেকোনো হস্তান্তর আইনসম্মতভাবে নিবন্ধিত হওয়া জরুরি।

নামজারি ও ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি নিজের নামে রেকর্ড করতে নামজারি বা খারিজ করতে হয়। বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি ব্যবস্থায় অনলাইনে আবেদন করা যায়। আবেদনের সঙ্গে ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদ, পূর্ববর্তী খতিয়ান ও দলিল এবং প্রয়োজনে বণ্টননামা জমা দিতে হয়। নামজারির পর ভূমি উন্নয়ন কর নিজের নামে পরিশোধ শুরু করুন। হালনাগাদ রেকর্ড না থাকলে জমি বিক্রি, ঋণ গ্রহণ বা উন্নয়নে বাধা আসে এবং অন্য কেউ জাল দলিলে দাবি করার ঝুঁকি বাড়ে। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী অংশ ঠিক রেখে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর নাম রেকর্ডে তোলা উচিত।

পরিবারে শান্তি বজায় রাখার পরামর্শ

  • মৃত্যুর পর দ্রুত সম্পত্তি ও ঋণের তালিকা তৈরি করুন।
  • সব উত্তরাধিকারীকে, বিশেষ করে নারী ও প্রবাসীদের, প্রক্রিয়ায় যুক্ত রাখুন।
  • অংশের হিসাব লিখিতভাবে সবার সঙ্গে শেয়ার করুন।
  • বিরোধ হলে প্রথমে পারিবারিক আলোচনা বা মধ্যস্থতার চেষ্টা করুন।
  • চূড়ান্ত বণ্টন নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে সম্পন্ন করুন।

স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা বজায় রাখলে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বণ্টন পরিবারের বন্ধনকে দুর্বল না করে বরং আরও দৃঢ় করতে পারে।

আরেকটি উদাহরণ: শুধু মেয়ে ও বাবা-মা

ধরা যাক, করিম সাহেব মারা গেলেন এবং রেখে গেলেন স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং জীবিত বাবা-মা; কোনো ছেলে নেই। সন্তান থাকায় স্ত্রী পাবেন এক-অষ্টমাংশ, মা এক-ষষ্ঠাংশ এবং বাবা এক-ষষ্ঠাংশ। দুই মেয়ে মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ পাবেন। এই অংশগুলো যোগ করলে এক-এর বেশি হয়, তাই আউল নীতিতে সবার অংশ আনুপাতিকভাবে কমবে, এবং বাবা এখানে অবশিষ্টাংশ পাবেন না কারণ কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এই উদাহরণ দেখায় কেন প্রতিটি পরিবারের জন্য আলাদা হিসাব প্রয়োজন এবং কেন আন্দাজে ভাগ করা ঝুঁকিপূর্ণ।

কখন আইনজীবীর সহায়তা নেবেন

উত্তরাধিকারীদের মধ্যে মতবিরোধ, নারীদের বঞ্চিত করার চেষ্টা, জাল দলিলের সন্দেহ, প্রবাসী উত্তরাধিকারী, একাধিক বিয়ে থেকে সন্তান, বা ব্যাংক ও শেয়ারের মতো জটিল সম্পদ থাকলে অবশ্যই অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন। তিনি সঠিক অংশ নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় সনদ সংগ্রহ, দলিল প্রস্তুত এবং প্রয়োজনে আদালতে আপনার অধিকার রক্ষায় সাহায্য করতে পারেন।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন ও আধুনিক বাস্তবতা

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন নিয়ে সমাজে নানা আলোচনা আছে, বিশেষ করে নারীর অংশ নিয়ে। ইসলামি আইনবিদরা ব্যাখ্যা করেন যে নারীর অংশ কম হলেও তার ওপর পরিবারের ভরণপোষণের দায় নেই এবং তিনি দেনমোহর পান, অন্যদিকে পুরুষের ওপর ভরণপোষণের দায়িত্ব। বাংলাদেশের আদালত মুসলিম উত্তরাধিকার আইন প্রয়োগে শরিয়তের নির্ধারিত অংশ অনুসরণ করেন। পরিবারগুলো চাইলে জীবদ্দশায় হেবা ও ওসিয়তের সুযোগ ব্যবহার করে বিশেষ প্রয়োজন, যেমন অসুস্থ সন্তান বা বিধবা মেয়ের নিরাপত্তা, বিবেচনা করতে পারে, তবে তা আইন ও ধর্মীয় নিয়মের সীমার মধ্যে। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকলে পরিবারের প্রত্যেক সদস্য তার ন্যায্য অধিকার বুঝে নিতে পারেন, এবং মুসলিম উত্তরাধিকার আইন মেনে বণ্টন করলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে বিরোধের সম্ভাবনাও কমে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা

  • মৃত্যু সনদ ও মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
  • ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে ওয়ারিশ সনদ।
  • প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সনদ।
  • জমির মূল দলিল, খতিয়ান, পর্চা ও ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ।
  • ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র ও শেয়ারের কাগজ।
  • কাবিননামা, দেনমোহর ও ঋণ সংক্রান্ত কাগজ।
  • ওসিয়ত বা হেবা থাকলে তার দলিল।

এই কাগজগুলো আগে থেকে গুছিয়ে রাখলে বণ্টন, নামজারি ও ব্যাংকের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়। মূল কাগজ একজন বিশ্বস্ত উত্তরাধিকারীর কাছে রেখে বাকিদের সত্যায়িত কপি দেওয়া যায়, যাতে কেউ পরে কাগজ লুকিয়ে রাখার অভিযোগ তুলতে না পারেন। সব কাগজের স্ক্যান কপি অনলাইনে নিরাপদে সংরক্ষণ করাও ভালো অভ্যাস। প্রয়োজনে প্রতিটি কাগজ কার কাছে আছে তার একটি তালিকাও সবার সঙ্গে শেয়ার করুন। এতে পারস্পরিক আস্থা বাড়ে এবং ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কমে।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন

মেয়েরা কি বাবার সম্পত্তি পায়?

হ্যাঁ। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী মেয়েরা নির্দিষ্ট অংশ পায়; ছেলে থাকলে ছেলের অর্ধেক।

স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির কত অংশ পান?

সন্তান থাকলে এক-অষ্টমাংশ, না থাকলে এক-চতুর্থাংশ; একাধিক স্ত্রী থাকলে তারা এই অংশ ভাগ করে নেন।

এতিম নাতি-নাতনি কি সম্পত্তি পায়?

হ্যাঁ। ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৪ ধারা অনুযায়ী তারা মৃত বাবা বা মায়ের অংশ পায়।

ওসিয়ত কতটুকু করা যায়?

সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ; উত্তরাধিকারীর অনুকূলে হলে অন্যদের সম্মতি লাগে।

দেনমোহর কি আগে দিতে হয়?

হ্যাঁ। দেনমোহর ঋণ হিসেবে বণ্টনের আগে পরিশোধ করতে হয়।

কেউ অংশ না দিলে কী করব?

বণ্টনের দাবিতে আদালতে বাটোয়ারা মামলা করা যায়।

আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি

আমরা মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী অংশ নির্ধারণ, ওয়ারিশ ও উত্তরাধিকার সনদ, বণ্টননামা দলিল, নামজারি, বাটোয়ারা মামলা এবং প্রবাসী উত্তরাধিকারীদের প্রতিনিধিত্বে সহায়তা করি। ব্যারিস্টার মেহেরুবা মাহবুব সম্পর্কে জানতে আমাদের পরিচিতি পাতা দেখুন।

যোগাযোগ করুন

পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে জটিলতা?

আমরা সঠিক হিসাব, প্রয়োজনীয় দলিল ও আইনি পদক্ষেপে আপনার অধিকার সুরক্ষা করব।

পরামর্শ বুক করুনআমাদের সম্পর্কে

প্রাথমিক উৎস: মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন ১৯৩৭, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ ও উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫, বাংলাদেশ আইন পোর্টাল; ভূমি রেকর্ড ও নামজারি, ভূমি মন্ত্রণালয়।

এই লেখাটি অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে সাধারণ তথ্য, আইনি বা ধর্মীয় পরামর্শ নয়। প্রতিটি পরিবারের হিসাব আলাদা; পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

Written by

Related Posts

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *