ভাই-বোন, চাচাতো ভাই বা কয়েকজন ক্রেতা মিলে একটি জমির মালিক হলে প্রত্যেকে কাগজে অংশীদার, কিন্তু মাটিতে কারও নির্দিষ্ট ভাগ নেই। দখল নিয়ে বিরোধ, নামজারি আটকে থাকা আর বিক্রি করতে না পারার সমস্যা তখন নিত্যদিনের। আপসে ভাগ না হলে আদালতের মাধ্যমে প্রত্যেকের অংশ ঘোষণা ও আলাদা করে দেওয়ার পথই হলো বাটোয়ারা মামলা।

- যৌথ মালিকানার (এজমালি) সম্পত্তিতে যেকোনো সহ-শরিক আদালতে নিজের অংশ আলাদা করে চাইতে পারেন; এর আইনি ভিত্তি দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮ ও বাটোয়ারা আইন ১৮৯৩।
- মামলায় সব সহ-শরিককে পক্ষ করতে হয়; কাউকে বাদ দিলে ডিক্রি দুর্বল হয়ে পড়ে।
- আদালত প্রথমে প্রাথমিক ডিক্রিতে প্রত্যেকের অংশ ঘোষণা করেন, তারপর অ্যাডভোকেট কমিশনারের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ডিক্রিতে জমি ভাগ করে দেন।
- ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী উত্তরাধিকারের জমিতে আলাদা খতিয়ান পেতে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আপস দলিল লাগে; আপস না হলে আদালতের ডিক্রিই ভরসা।
- মামলার চেয়ে আপসে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রায় সবসময় দ্রুত ও কম খরচের।
বাটোয়ারা মামলা কী এবং কখন দরকার
একাধিক ব্যক্তি যখন একটি সম্পত্তির যৌথ মালিক হন, তখন আইনের ভাষায় তাঁরা সহ-শরিক। প্রত্যেকের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন এক-চতুর্থাংশ) আছে, কিন্তু জমির কোন অংশটি কার, তা চিহ্নিত নেই। এই অবস্থাকে বলা হয় এজমালি বা অবিভক্ত সম্পত্তি।
সহ-শরিকেরা একমত হলে একটি নিবন্ধিত বণ্টননামা (partition deed) করে নিজেরাই জমি ভাগ করতে পারেন। কিন্তু কেউ রাজি না হলে, কেউ পুরো জমি দখল করে রাখলে, বা অংশ নিয়ে বিরোধ থাকলে আদালতে যেতে হয়। আদালতে যৌথ সম্পত্তি ভাগের জন্য যে দেওয়ানি মামলা করা হয়, সেটিই বাটোয়ারা মামলা (partition suit)।
বাস্তবে বাটোয়ারা মামলা সবচেয়ে বেশি হয় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি নিয়ে। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর সন্তানেরা ওয়ারিশ হন, কিন্তু বছরের পর বছর জমি ভাগ হয় না। এক প্রজন্ম পার হলে শরিকের সংখ্যা বেড়ে যায়, আর বিরোধও জটিল হয়।
যেসব পরিস্থিতিতে মামলা ছাড়া উপায় থাকে না
- কোনো সহ-শরিক বণ্টননামায় সই করতে রাজি নন বা যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
- একজন শরিক পুরো জমি বা বেশি অংশ দখল করে অন্যদের বঞ্চিত করছেন।
- কে কত অংশ পাবেন, তা নিয়ে বিরোধ আছে, যেমন কোনো ওয়ারিশকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
- কোনো শরিক তাঁর অংশ বাইরের লোকের কাছে বিক্রি করেছেন এবং ক্রেতা নির্দিষ্ট জায়গা দাবি করছেন।
- নাবালক বা বিদেশে থাকা শরিকের কারণে আপস দলিল করা সম্ভব হচ্ছে না।
আইনি কাঠামো: কোন আইন প্রযোজ্য
বাংলাদেশে বাটোয়ারার জন্য আলাদা কোনো আধুনিক আইন নেই; কয়েকটি পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত আইন একসঙ্গে কাজ করে।
| আইন | কী নির্ধারণ করে |
|---|---|
| দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮ | মামলা দাখিল, পক্ষভুক্তি, প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ডিক্রি (আদেশ ২০ বিধি ১৮), কমিশন নিয়োগ, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ও ডিক্রি জারি |
| বাটোয়ারা আইন ১৮৯৩ | ভাগ করা অযৌক্তিক হলে সম্পত্তি বিক্রির আদেশ এবং পারিবারিক বসতবাড়িতে শরিকের অগ্রাধিকার |
| মুসলিম বা হিন্দু উত্তরাধিকার আইন | উত্তরাধিকারের জমিতে কে কত অংশ পাবেন |
| কোর্ট ফি আইন ১৮৭০ | আরজি ও ছাহাম দাবির জন্য কোর্ট ফি |
| তামাদি আইন ১৯০৮ | বেদখল ও প্রতিকূল দখলের প্রশ্ন |
| রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ | সহ-শরিকের অংশ বাইরে বিক্রি হলে অগ্রক্রয় (pre-emption) |
প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ডিক্রির ধারণা
দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ২০ বিধি ১৮ অনুযায়ী বাটোয়ারা মামলায় আদালত দুই ধাপে রায় দেন। প্রথমে প্রাথমিক ডিক্রিতে (preliminary decree) ঘোষণা করা হয় কোন শরিক কত অংশের মালিক। তারপর জমি মেপে ভাগ করে চূড়ান্ত ডিক্রিতে (final decree) প্রত্যেকের নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করা হয়। দুটি ধাপই আলাদা গুরুত্বপূর্ণ, এবং দুটির বিরুদ্ধেই আপিলের সুযোগ আছে।

মামলার আগে আপসে বণ্টনের চেষ্টা
অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলি, বাটোয়ারা মামলা শেষ উপায় হওয়া উচিত। মামলা কয়েক বছর চলতে পারে, আর এর মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। তাই আদালতে যাওয়ার আগে আপসে নিবন্ধিত বণ্টননামা করার চেষ্টা করুন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর নির্দেশনা অনুযায়ী উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারি সব ওয়ারিশের নামে যৌথভাবে একটি খতিয়ানে করতে হয়। কোনো ওয়ারিশ আলাদা খতিয়ান চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা নিবন্ধিত আপস দলিল লাগবে। ফলে মৌখিক ভাগাভাগি বা সাদা কাগজের চুক্তি এখন আর আলাদা নামজারির জন্য যথেষ্ট নয়।
যেখানে আপস হয় না, সেখানে আদালতের চূড়ান্ত ডিক্রিই আলাদা মালিকানা ও আলাদা খতিয়ানের ভিত্তি হয়। অর্থাৎ ২০২৫-এর নির্দেশনার পর বাটোয়ারা মামলার ব্যবহারিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
মামলা দায়েরের আগে সব শরিককে লিখিত আইনি নোটিশ দিয়ে আপসে বণ্টনের প্রস্তাব দিন। আদালতে এই নোটিশ দেখায় যে আপনি আগে শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছিলেন, আর অনেক সময় নোটিশ পেয়েই অন্য শরিকেরা আলোচনায় বসেন।
মধ্যস্থতা ও মামলার ভেতরে আপস
মামলা চলাকালেও আপস সম্ভব। দেওয়ানী কার্যবিধির ৮৯ক ধারা অনুযায়ী আদালত লিখিত জবাব দাখিলের পর বিরোধ মধ্যস্থতার জন্য পাঠাতে পারেন। পক্ষগণ একমত হলে আপসনামা দাখিল করে সেই অনুযায়ী ডিক্রি নেওয়া যায়, যা পূর্ণ বিচারের চেয়ে অনেক দ্রুত।
বাটোয়ারা মামলা কে করতে পারেন এবং কাদের পক্ষ করতে হয়
যৌথ সম্পত্তির যেকোনো সহ-শরিক বাদী হয়ে বাটোয়ারা মামলা করতে পারেন। উত্তরাধিকারী, শরিকের কাছ থেকে অংশ কেনা ক্রেতা, এমনকি দানসূত্রে অংশ পাওয়া ব্যক্তিও সহ-শরিক হিসেবে গণ্য হন, যদি তাঁর মালিকানার কাগজ ঠিক থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো, সম্পত্তির সব সহ-শরিককে মামলায় পক্ষ করতে হবে। যিনি মামলায় নেই, তাঁর বিরুদ্ধে ডিক্রি কার্যকর নয়। একজন শরিক বাদ পড়লে পরে তিনি নতুন মামলা করে পুরো ভাগ চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। তাই ওয়ারিশ সনদ ও খতিয়ান মিলিয়ে নির্ভুল তালিকা তৈরি করা জরুরি।
মৃত শরিক ও নাবালক
কোনো শরিক মারা গেলে তাঁর সব ওয়ারিশকে পক্ষ করতে হয়। মামলা চলাকালে কোনো পক্ষ মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাঁর ওয়ারিশদের প্রতিস্থাপনের আবেদন করতে হয়, না হলে মামলা সেই পক্ষের বিরুদ্ধে বাতিল হয়ে যেতে পারে। নাবালক শরিকের পক্ষে আদালত অভিভাবক নিয়োগ করেন। ওয়ারিশ নির্ধারণে সমস্যা থাকলে আমাদের উত্তরাধিকার সনদ গাইড দেখুন।
কোন আদালতে মামলা করবেন
দেওয়ানী কার্যবিধির ১৬ ধারা অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তির মামলা করতে হয় সেই আদালতে, যার এলাকায় সম্পত্তি অবস্থিত। একাধিক জেলায় সম্পত্তি থাকলে যেকোনো একটি জেলার উপযুক্ত আদালতে মামলা করা যায়।
আর্থিক এখতিয়ার নির্ধারিত হয় দেওয়ানী আদালত আইন ১৮৮৭ দিয়ে। ২০২১ সালের সংশোধনীর পর সহকারী জজ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত, সিনিয়র সহকারী জজ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং যুগ্ম জেলা জজ এর বেশি মূল্যমানের মামলা বিচার করেন। মামলার মূল্যমান ঠিকভাবে নির্ধারণ না করলে আরজি ফেরত আসতে পারে, তাই এটি শুরুতেই আইনজীবীর সঙ্গে ঠিক করুন।
দেওয়ানি মামলার ধরন ও আদালতের কাঠামো সম্পর্কে আরও জানতে আমাদের দেওয়ানি মামলার ধরন বিষয়ক লেখাটি পড়ুন।
উত্তরাধিকারের জমিতে অংশ হিসাব: একটি উদাহরণ
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির বাটোয়ারা মামলায় আদালত প্রথমে দেখেন মৃত ব্যক্তির ধর্ম অনুযায়ী কোন উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য। মুসলিমদের ক্ষেত্রে ফারায়েজ, হিন্দুদের ক্ষেত্রে সাধারণত দায়ভাগ বিধান প্রযোজ্য হয়। অংশ ভুল হিসাব করলে পুরো আরজি দুর্বল হয়ে যায়, তাই শুরুতেই এটি নির্ভুল করা জরুরি।
একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। একজন মুসলিম ব্যক্তি মারা গেলেন, রেখে গেলেন স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সন্তান থাকায় স্ত্রী পাবেন সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ। বাকি সাত-অষ্টমাংশ সন্তানেরা পাবেন এমনভাবে যে প্রত্যেক ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ পান। হিসাব করলে প্রত্যেক ছেলে পাবেন ৭/২০ অংশ এবং মেয়ে পাবেন ৭/৪০ অংশ। চল্লিশ ভাগে দেখলে স্ত্রী ৫, প্রত্যেক ছেলে ১৪ এবং মেয়ে ৭ ভাগ, মোট ৪০।
বাস্তবে হিসাব প্রায়ই আরও জটিল হয়, কারণ মূল মালিকের পর কোনো ওয়ারিশও মারা যেতে পারেন, কেউ নিজের অংশ বিক্রি বা দান করে থাকতে পারেন। প্রতিটি মৃত্যুর পর আলাদা ধাপে অংশ ভাগ করতে হয়, আর প্রতিটি হস্তান্তর দলিল দিয়ে মিলিয়ে নিতে হয়। হিন্দু উত্তরাধিকারে, বিশেষ করে নারী উত্তরাধিকারীদের অধিকারের প্রশ্নে, নিয়ম ভিন্ন এবং বিষয়টি বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দাবি করে।
বাটোয়ারা মামলার ধাপসমূহ
প্রতিটি মামলার ঘটনা আলাদা, তবে একটি সাধারণ বাটোয়ারা মামলা মোটামুটি নিচের ক্রমে এগোয়।
- কাগজপত্র সংগ্রহ ও অংশ হিসাব। সিএস, এসএ, আরএস ও সর্বশেষ জরিপের খতিয়ান, দলিল, ওয়ারিশ সনদ ও মৌজা নকশা সংগ্রহ করে উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের অংশ হিসাব করুন।
- আইনি নোটিশ ও আপসের চেষ্টা। সব শরিককে লিখিত প্রস্তাব দিন। আপস হলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বণ্টননামা নিবন্ধন করুন; না হলে মামলার প্রস্তুতি নিন।
- আরজি দাখিল। সম্পত্তির তফসিল, প্রত্যেক শরিকের অংশ, দখলের অবস্থা ও প্রার্থিত প্রতিকার উল্লেখ করে উপযুক্ত আদালতে আরজি দাখিল করুন এবং নির্ধারিত কোর্ট ফি দিন।
- সমন ও লিখিত জবাব। আদালত বিবাদীদের সমন পাঠান। বিবাদীরা লিখিত জবাব দেন এবং চাইলে নিজেদের অংশের জন্য আলাদা ছাহাম দাবি করেন।
- বিচার্য বিষয় ও সাক্ষ্য। আদালত বিচার্য বিষয় নির্ধারণ করেন। পক্ষগণ দলিল ও সাক্ষী হাজির করেন। প্রয়োজনে মধ্যস্থতায় পাঠানো হয়।
- প্রাথমিক ডিক্রি। শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেক শরিকের অংশ ঘোষণা করে প্রাথমিক ডিক্রি দেন।
- কমিশন ও চূড়ান্ত ডিক্রি। অ্যাডভোকেট কমিশনার সরেজমিনে জমি মেপে ছাহাম আলাদা করে প্রতিবেদন দেন। আপত্তি শুনে আদালত চূড়ান্ত ডিক্রি দেন।
- দখল বুঝে নেওয়া। কেউ দখল ছাড়তে না চাইলে ডিক্রি জারির (execution) মামলা করে আদালতের মাধ্যমে দখল নিতে হয়।
- নামজারি। চূড়ান্ত ডিক্রির সার্টিফায়েড কপি দিয়ে নিজের অংশের আলাদা নামজারি ও খতিয়ান করুন এবং ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ শুরু করুন।

প্রাথমিক ডিক্রি, ছাহাম ও চূড়ান্ত ডিক্রি
বাটোয়ারা মামলার মূল কাজ দুটি: অংশ নির্ধারণ এবং জায়গা নির্ধারণ। প্রথমটি হয় প্রাথমিক ডিক্রিতে, দ্বিতীয়টি চূড়ান্ত ডিক্রিতে।
প্রাথমিক ডিক্রিতে কী থাকে
প্রাথমিক ডিক্রিতে আদালত ঘোষণা করেন সম্পত্তিটি আসলেই যৌথ কি না, কারা সহ-শরিক, এবং প্রত্যেকের অংশ কত। এখানে মালিকানা, দলিলের বৈধতা, ওয়ারিশ কারা এবং কোনো হস্তান্তর টিকবে কি না, এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়। প্রাথমিক ডিক্রি নিজেই আপিলযোগ্য, এবং এর বিরুদ্ধে সময়মতো আপিল না করলে পরে চূড়ান্ত ডিক্রির আপিলে অংশ নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন হয়ে যায়।
ছাহাম কী
বাটোয়ারা মামলায় শুধু বাদী নন, প্রত্যেক বিবাদীও নিজের অংশ আলাদা করে চাইতে পারেন। এই আলাদা অংশকে বলা হয় ছাহাম। বিবাদী ছাহাম চাইলে নির্ধারিত কোর্ট ফি দিয়ে তা দাবি করতে হয়। আদালত সাধারণত চেষ্টা করেন যার যেখানে দীর্ঘদিনের দখল, বসতবাড়ি বা স্থাপনা আছে, তাঁকে সম্ভব হলে সেই অংশেই ছাহাম দিতে, যাতে অযথা ভাঙচুর না হয়।
অ্যাডভোকেট কমিশনার ও চূড়ান্ত ডিক্রি
প্রাথমিক ডিক্রির পর আদালত সাধারণত একজন অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করেন। তিনি পক্ষগণকে নোটিশ দিয়ে সরেজমিনে জমি পরিমাপ করেন, প্রয়োজনে সার্ভেয়ারের সাহায্য নেন, এবং প্রত্যেকের অংশ অনুযায়ী সীমানা চিহ্নিত করে নকশাসহ প্রতিবেদন দেন। পক্ষগণ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আপত্তি দিতে পারেন। শুনানি শেষে আদালত প্রতিবেদন গ্রহণ, সংশোধন বা নতুন কমিশন দিতে পারেন, তারপর চূড়ান্ত ডিক্রি দেন।
অনেকে প্রাথমিক ডিক্রি পেয়েই থেমে যান। কিন্তু প্রাথমিক ডিক্রি শুধু অংশ ঘোষণা করে; জমির কোন অংশ আপনার, তা চিহ্নিত করে না। চূড়ান্ত ডিক্রি না হওয়া পর্যন্ত আলাদা নামজারি বা নিশ্চিন্তে বিক্রি করা যায় না।
ভাগ সম্ভব না হলে: বিক্রির আদেশ ও শরিকের অগ্রাধিকার
কিছু সম্পত্তি ভাগ করা বাস্তবসম্মত নয়, যেমন ছোট একটি ফ্ল্যাট, একটি দোকানঘর বা শহরের ছোট প্লট। বাটোয়ারা আইন ১৮৯৩-এর ২ ধারা অনুযায়ী আদালত যদি মনে করেন সম্পত্তির ধরন, শরিকের সংখ্যা বা অন্য কারণে ভাগ করা অযৌক্তিক বা ক্ষতিকর, এবং অন্তত অর্ধেক অংশের মালিক শরিকেরা বিক্রির অনুরোধ করেন, তাহলে আদালত সম্পত্তি বিক্রি করে মূল্য ভাগ করে দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন।
৩ ধারা অনুযায়ী এমন ক্ষেত্রে অন্য শরিকেরা মূল্যায়িত দামে বিক্রির জন্য আবেদনকারীদের অংশ কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারেন। ফলে সম্পত্তি পরিবারের বাইরে না গিয়েও বিরোধ মিটতে পারে।
পারিবারিক বসতবাড়ি ও কৃষি জমি
৪ ধারা একটি বিশেষ সুরক্ষা দেয়। অবিভক্ত পরিবারের বসতবাড়ির কোনো অংশ পরিবারের বাইরের কেউ কিনে বাটোয়ারা মামলা করলে, পরিবারের কোনো শরিক মূল্যায়িত দামে সেই ক্রেতার অংশ কিনে নিতে পারেন। উদ্দেশ্য হলো, বাইরের লোক যেন পারিবারিক বসতবাড়িতে জোর করে ঢুকতে না পারেন।
কৃষি জমির ক্ষেত্রে আলাদা একটি সুরক্ষা আছে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এ: কোনো শরিক তাঁর অংশ বাইরের কারও কাছে বিক্রি করলে অন্য সহ-শরিক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন। এটি বাটোয়ারা মামলা থেকে আলাদা প্রতিকার, তবে প্রায়ই একসঙ্গে প্রাসঙ্গিক হয়।
বাটোয়ারা মামলার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
কাগজ যত গোছানো, মামলা তত মসৃণ। নিচের তালিকাটি প্রস্তুতির চেকলিস্ট হিসেবে ব্যবহার করুন।
| কাগজ | কেন দরকার |
|---|---|
| সিএস, এসএ, আরএস ও সর্বশেষ জরিপের খতিয়ান | মালিকানার ধারাবাহিকতা প্রমাণ |
| মূল দলিল ও বায়া দলিল (সার্টিফায়েড কপি) | ক্রয় বা দানসূত্রে অংশ প্রমাণ |
| ওয়ারিশ সনদ ও মৃত্যু সনদ | উত্তরাধিকারী ও তাঁদের অংশ নির্ধারণ |
| নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর | সর্বশেষ রেকর্ডের অবস্থা |
| ভূমি উন্নয়ন কর রসিদ | দখল ও রেকর্ডের সমর্থন |
| মৌজা নকশা ও দাগের বিবরণ | তফসিল ও কমিশনের কাজ |
| আগের কোনো মামলার রায় বা আপসনামা | রেস জুডিকাটা বা আগের বণ্টন যাচাই |
খতিয়ান ও নামজারির কপি অনলাইনে ভূমিসেবা প্ল্যাটফর্ম থেকে তোলা যায়। দলিলের সার্টিফায়েড কপি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সংগ্রহ করতে হয়। জমির রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের জমি নিবন্ধন গাইড সহায়ক হবে।
সময়, খরচ ও মামলা চলাকালে সুরক্ষা
একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাটোয়ারা মামলা শেষ হতে সাধারণত কয়েক বছর লাগে; শরিক বেশি হলে, প্রাথমিক ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল হলে বা কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি চললে সময় আরও বাড়ে। আপসে নিষ্পত্তি হলে কয়েক মাসেও শেষ হতে পারে। আমরা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নিশ্চয়তা দিই না, কারণ আদালতের কার্যতালিকা ও পক্ষগণের আচরণ বড় ভূমিকা রাখে।
খরচের মধ্যে আছে কোর্ট ফি, আইনজীবীর ফি, কমিশনার ও সার্ভেয়ারের ফি, কাগজ তোলার খরচ এবং চূড়ান্ত ডিক্রি প্রস্তুতির খরচ। কোর্ট ফি নির্ভর করে বাদী দখলে আছেন কি না এবং মামলার মূল্যমান কত তার ওপর, আর এর হিসাব কোর্ট ফি আইন ১৮৭০ ও সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী হয়। মামলা দায়েরের আগে আইনজীবীর কাছ থেকে লিখিত হিসাব নিন।
অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা
মামলা চলাকালে কোনো শরিক জমিতে নতুন স্থাপনা তুলতে, গাছ কাটতে বা নির্দিষ্ট অংশ বিক্রি করতে চাইলে বাদী দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৩৯ অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করতে পারেন। মামলার বিষয়বস্তু অবস্থায় রাখার (status quo) আদেশও চাওয়া যায়। জোর করে দখল বা জাল কাগজ তৈরির ঘটনায় ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩-এর প্রতিকারও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
আপিল
প্রাথমিক বা চূড়ান্ত ডিক্রিতে সংক্ষুব্ধ পক্ষ আপিল করতে পারেন। সহকারী জজ ও সিনিয়র সহকারী জজের ডিক্রির আপিল জেলা জজ আদালতে যায়। ২০২১ সালের সংশোধনীর পর যুগ্ম জেলা জজের ডিক্রির ক্ষেত্রে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের আপিলও জেলা জজ আদালতে হয়, এর বেশি হলে হাইকোর্ট বিভাগে। আপিলের সময়সীমা কঠোর, তাই রায় পাওয়ার পরপরই আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করুন।
তামাদি ও বেদখলের প্রশ্ন
যতদিন সহ-মালিকানা বজায় থাকে, ততদিন বাটোয়ারা চাওয়ার অধিকারও থাকে, কারণ একজন শরিকের দখল সাধারণত সবার পক্ষে দখল হিসেবে গণ্য হয়। তবে কোনো শরিককে স্পষ্টভাবে বেদখল (ouster) করে অন্যজন দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে একক মালিক হিসেবে ভোগ করলে প্রতিকূল দখলের প্রশ্ন ওঠে। তাই দেরি না করে বাটোয়ারা মামলা দায়ের করাই নিরাপদ।
ডিক্রির পর: দখল, নামজারি ও বিক্রি
চূড়ান্ত ডিক্রি পাওয়ার পর তিনটি কাজ বাকি থাকে। প্রথমত, চূড়ান্ত ডিক্রি নির্ধারিত মূল্যের স্ট্যাম্পে প্রস্তুত করতে হয়; এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা ও প্রচলিত স্ট্যাম্প শুল্ক মেনে চলুন। দ্বিতীয়ত, অন্য শরিক দখল না ছাড়লে ডিক্রি জারির মামলা করে আদালতের মাধ্যমে দখল নিতে হয়।
তৃতীয়ত, চূড়ান্ত ডিক্রির সার্টিফায়েড কপি দিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নিজের অংশের নামজারির আবেদন করুন। রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ৫২ক ধারা অনুযায়ী বিক্রেতার নাম সর্বশেষ খতিয়ানে না থাকলে বিক্রয় দলিল নিবন্ধন হয় না। তাই বাটোয়ারা মামলার পর নামজারি সম্পন্ন না করে জমি বিক্রির চেষ্টা করবেন না।
ক্রেতা হিসেবে যদি এজমালি জমির একটি অংশ কিনতে চান, তাহলে মনে রাখুন: বণ্টন না হওয়া পর্যন্ত আপনি একটি অংশ কিনছেন, নির্দিষ্ট জায়গা নয়। আমাদের বাড়ি কেনার আইনি প্রক্রিয়া বিষয়ক গাইডে এ ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আছে।
যৌথ সম্পত্তি ভাগে সাধারণ ভুলগুলো
- শরিক বাদ পড়া। কোনো ওয়ারিশ বা ক্রেতাকে পক্ষ না করা, যা পরে পুরো ডিক্রিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
- ভুল তফসিল। দাগ নম্বর, খতিয়ান বা জমির পরিমাণে ভুল, ফলে কমিশনের কাজ আটকে যায়।
- প্রতিস্থাপনে দেরি। কোনো পক্ষ মারা গেলে সময়মতো ওয়ারিশ প্রতিস্থাপন না করা।
- প্রাথমিক ডিক্রিতে থেমে যাওয়া। চূড়ান্ত ডিক্রি ও নামজারি না করে বছরের পর বছর ফেলে রাখা।
- আপিলের সময় পার। প্রাথমিক ডিক্রি নিয়ে আপত্তি থাকলে নির্ধারিত সময়ে আপিল না করা।
- মামলা চলাকালে বিক্রি। বিচারাধীন জমি বিক্রি করা, যা ক্রেতা ও বিক্রেতা দুজনকেই ঝুঁকিতে ফেলে।
বাটোয়ারা মামলা নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
বাটোয়ারা মামলা করতে কি সব শরিকের সম্মতি লাগে?
না। যেকোনো একজন সহ-শরিক একাই মামলা করতে পারেন। তবে বাকি সব শরিককে বিবাদী বা প্রয়োজনীয় পক্ষ হিসেবে মামলায় যুক্ত করতে হবে।
বাটোয়ারা মামলা শেষ হতে কত সময় লাগে?
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মামলায় সাধারণত কয়েক বছর লাগে। মধ্যস্থতা বা আপসে নিষ্পত্তি হলে অনেক দ্রুত শেষ হয়। নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়।
শরিকের কাছ থেকে অংশ কেনা ক্রেতা কি মামলা করতে পারেন?
হ্যাঁ। বৈধ দলিলে অংশ কেনা ক্রেতা সহ-শরিক হন এবং বাটোয়ারা চাইতে পারেন। তবে পারিবারিক বসতবাড়ির ক্ষেত্রে বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারায় পরিবারের শরিক তাঁর অংশ কিনে নিতে পারেন।
প্রাথমিক ডিক্রি দিয়ে কি আলাদা নামজারি করা যায়?
সাধারণত না। প্রাথমিক ডিক্রি শুধু অংশ ঘোষণা করে। নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত হয় চূড়ান্ত ডিক্রিতে, আর সেটির ভিত্তিতেই আলাদা নামজারি করা হয়।
জমি ভাগ করা সম্ভব না হলে কী হয়?
বাটোয়ারা আইন ১৮৯৩-এর ২ ও ৩ ধারা অনুযায়ী আদালত সম্পত্তি বিক্রি করে মূল্য ভাগের আদেশ দিতে পারেন, আর অন্য শরিকেরা মূল্যায়িত দামে অংশ কিনে নেওয়ার সুযোগ পান।
বিদেশে থাকলে কি মামলা করা যায়?
হ্যাঁ। বিদেশে সম্পাদিত আমমোক্তারনামা দেশে আসার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রত্যয়ন করিয়ে প্রতিনিধির মাধ্যমে মামলা পরিচালনা করা যায়।
আমরা যেভাবে সাহায্য করতে পারি
আমরা যৌথ সম্পত্তির কাগজ যাচাই, অংশ হিসাব, আপসে বণ্টননামা প্রস্তুত ও নিবন্ধন, এবং প্রয়োজনে বাটোয়ারা মামলা দায়ের থেকে চূড়ান্ত ডিক্রি, দখল ও নামজারি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করি। আমাদের রিয়েল এস্টেট আইন সেবা সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।
যৌথ জমি ভাগ নিয়ে বিরোধে আছেন?
আমরা আপনার কাগজ যাচাই করে প্রথমে আপসের পথ খুঁজি, আর প্রয়োজন হলে আদালতে আপনার অংশ রক্ষা করি।
পরামর্শ বুক করুনরিয়েল এস্টেট সেবাপ্রাথমিক সূত্র: দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮, বাটোয়ারা আইন ১৮৯৩, দেওয়ানী আদালত আইন ১৮৮৭, রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ ও তামাদি আইন ১৯০৮, বাংলাদেশের আইন পোর্টাল; খতিয়ান ও নামজারি, ভূমি মন্ত্রণালয়; আদালত সংক্রান্ত তথ্য, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
এই লেখাটি ২০২৬ সালের বাংলাদেশি আইন সম্পর্কে সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। ফি, কর, বিধিমালা ও প্রক্রিয়া পরিবর্তন হতে পারে; কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা একজন যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করুন।



0 Comments