দেনমোহর আদায় একজন মুসলিম স্ত্রীর আইনগত অধিকার, কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়। বিয়ের সময় কাবিননামায় যে দেনমোহর লেখা হয়, স্বামী তা পরিশোধ করতে বাধ্য। স্বামী টাকা না দিলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে দেনমোহর আদায় করতে পারেন। এই লেখায় সহজ ভাষায় দেখানো হলো কখন, কোথায় ও কীভাবে মামলা করবেন, কী প্রমাণ লাগবে এবং রায়ের পর টাকা কীভাবে হাতে পাবেন।

- দেনমোহর স্ত্রীর একক সম্পত্তি; স্বামী বা তার পরিবার তা মাফ করাতে চাপ দিতে পারে না।
- কাবিননামায় পরিশোধের পদ্ধতি লেখা না থাকলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ১০ ধারা অনুযায়ী পুরো দেনমোহর চাহিবামাত্র পরিশোধযোগ্য।
- দেনমোহর আদায় মামলা পারিবারিক আদালতে করতে হয়; বর্তমানে পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ এই আদালতের কাজ পরিচালনা করে।
- তাৎক্ষণিক দেনমোহর দাবি করে না পেলে এবং বিলম্বিত দেনমোহর তালাক বা মৃত্যুর পর, সাধারণত ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হয়।
- রায় পাওয়ার পর স্বামী টাকা না দিলে জারি মামলার মাধ্যমে দেনমোহর আদায় করা যায়।
দেনমোহর কী এবং কেন এটি স্ত্রীর অধিকার
মুসলিম আইনে বিয়ে একটি দেওয়ানি চুক্তি, আর দেনমোহর সেই চুক্তির একটি অপরিহার্য অংশ। বিয়ের বিনিময়ে স্বামী স্ত্রীকে যে অর্থ বা সম্পদ দিতে অঙ্গীকার করেন, তাকেই দেনমোহর বলে। কাবিননামায় দেনমোহরের পরিমাণ লেখা থাকে এবং এটি স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি। স্ত্রী চাইলে এই টাকা নিজের ইচ্ছামতো খরচ, সঞ্চয় বা দান করতে পারেন।
অনেক পরিবারে দেনমোহরকে শুধু কাগুজে বিষয় মনে করা হয়, কিংবা বিয়ের রাতে স্ত্রীকে দিয়ে দেনমোহর মাফ করিয়ে নেওয়া হয়। আইনের চোখে চাপ বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া এমন মাফের কোনো মূল্য নেই। তাই দেনমোহর আদায় করা স্ত্রীর সম্পূর্ণ বৈধ অধিকার, এবং আদালত এই অধিকার রক্ষা করে।
দেনমোহরের পরিমাণ কীভাবে নির্ধারিত হয়
সাধারণত বর ও কনে পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে দেনমোহরের পরিমাণ ঠিক করা হয় এবং কাবিননামার নির্দিষ্ট ঘরে লেখা হয়। পরিমাণ লেখা না থাকলে আদালত কনের পরিবারের অন্য নারীদের দেনমোহর, সামাজিক অবস্থান ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে যুক্তিসঙ্গত দেনমোহর (মোহরে মিসল) নির্ধারণ করতে পারেন।
তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত দেনমোহর
দেনমোহর আদায় করার আগে বুঝতে হবে দেনমোহর কোন ধরনের। দেনমোহর সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
| ধরন | কখন পরিশোধযোগ্য | মামলার সময়সীমা |
|---|---|---|
| তাৎক্ষণিক দেনমোহর (মু'আজ্জল) | স্ত্রী চাওয়া মাত্র | দাবি করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর সাধারণত ৩ বছর |
| বিলম্বিত দেনমোহর (মু'অজ্জল) | তালাক বা মৃত্যুর মাধ্যমে বিয়ে শেষ হলে, বা চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ে | বিয়ে বিচ্ছেদ বা মৃত্যুর পর সাধারণত ৩ বছর |
কাবিননামায় কতটুকু তাৎক্ষণিক আর কতটুকু বিলম্বিত তা লেখা থাকে। অনেক কাবিননামায় কিছু অংশ "উসুল" বা পরিশোধিত হিসেবে দেখানো হয়, যেমন গয়না বা নগদ টাকা। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ১০ ধারা অনুযায়ী, পরিশোধের পদ্ধতি নির্দিষ্ট করা না থাকলে পুরো দেনমোহর চাহিবামাত্র পরিশোধযোগ্য বলে গণ্য হয়। এই বিধান স্ত্রীর দেনমোহর আদায় সহজ করেছে।

কখন দেনমোহর আদায় মামলা করা যায়
বিয়ে চলমান থাকা অবস্থায়ও স্ত্রী তাৎক্ষণিক দেনমোহর দাবি করতে পারেন এবং না পেলে মামলা করতে পারেন। তালাক হলে, স্বামী তালাক দিন বা স্ত্রী তালাক দিন, অপরিশোধিত পুরো দেনমোহর পরিশোধযোগ্য হয়ে যায়। স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী অপরিশোধিত দেনমোহর স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে পাওয়ার অধিকারী, এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগের আগেই দেনমোহর ঋণ হিসেবে পরিশোধ করতে হয়।
স্ত্রী নিজে তালাক দিলে (তালাকে তাফয়ীজ) বা আদালতের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদ করলেও সাধারণভাবে দেনমোহরের অধিকার নষ্ট হয় না। তবে খুলা তালাকে স্ত্রী অনেক সময় দেনমোহর ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে বিচ্ছেদ নেন; সেক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত দেখে দেনমোহর আদায় করা যাবে কি না তা ঠিক হয়। তালাকের নিয়ম জানতে আমাদের মুসলিম আইনে তালাক বিষয়ক লেখাটি পড়ুন।
পারিবারিক আদালত ও প্রযোজ্য আইন
দেনমোহর আদায় মামলা পারিবারিক আদালতে দায়ের করতে হয়। দীর্ঘদিন পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ এর অধীনে এই আদালত কাজ করেছে; বর্তমানে পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ সেই অধ্যাদেশের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। সহকারী জজ আদালত পারিবারিক আদালত হিসেবে কাজ করে এবং বিয়ে বিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং অভিভাবকত্ব ও সন্তানের হেফাজত সংক্রান্ত মামলা শোনে।
সাধারণত স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করেন, সেই এলাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করা যায়। এটি নারীদের জন্য বড় সুবিধা, কারণ স্বামীর এলাকায় গিয়ে মামলা চালাতে হয় না। কোর্ট ফি নির্ধারিত ও তুলনামূলকভাবে কম, যাতে আর্থিক কারণে কেউ দেনমোহর আদায় থেকে বঞ্চিত না হন। বর্তমান কোর্ট ফি সম্পর্কে আদালত বা আইনজীবীর কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
মামলার আগে যে কাগজপত্র প্রস্তুত রাখবেন
সফলভাবে দেনমোহর আদায় করতে প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। মামলার আগে নিচের কাগজপত্র সংগ্রহ করুন:
- কাবিননামা। নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে কাবিননামার সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করুন। আসল কপি হারিয়ে গেলেও রেজিস্ট্রারের বালাম বই থেকে কপি পাওয়া যায়।
- তালাকের কাগজ। তালাক হয়ে থাকলে তালাকনামা, তালাকের নোটিশ এবং চেয়ারম্যান বা মেয়রের কার্যালয়ের কাগজ।
- দাবির প্রমাণ। দেনমোহর চেয়ে পাঠানো চিঠি, আইনি নোটিশ ও তার প্রাপ্তিস্বীকারপত্র।
- পরিচয়পত্র। স্ত্রী ও স্বামীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং ঠিকানা।
- পরিশোধের তথ্য। কোনো অংশ পরিশোধ হয়ে থাকলে তার হিসাব, যাতে সঠিক বকেয়া দাবি করা যায়।
- সাক্ষী। বিয়ে, দেনমোহর ও দাবির বিষয়ে জানেন এমন সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা।
দেনমোহর আদায় মামলার ধাপসমূহ
- দাবি জানানো। প্রথমে স্বামীর কাছে লিখিতভাবে দেনমোহর দাবি করুন। তাৎক্ষণিক দেনমোহরের ক্ষেত্রে এই দাবি ও প্রত্যাখ্যান থেকেই সময়সীমা গণনা শুরু হতে পারে।
- আইনি নোটিশ। আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠালে স্বামী অনেক সময় আলোচনায় আসেন এবং পরে মামলায় এটি প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে।
- আরজি দায়ের। পারিবারিক আদালতে আরজি দাখিল করুন, যেখানে বিয়ে, দেনমোহরের পরিমাণ, পরিশোধিত অংশ, দাবি ও প্রত্যাখ্যানের বিবরণ থাকবে।
- সমন ও জবাব। আদালত স্বামীকে সমন পাঠান এবং তিনি লিখিত জবাব দাখিল করেন।
- প্রাক-বিচার মীমাংসা। আইন অনুযায়ী আদালত বিচার শুরুর আগে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করেন। কিস্তিতে পরিশোধের মতো সমঝোতা এখানে হতে পারে।
- সাক্ষ্য ও শুনানি। মীমাংসা না হলে উভয় পক্ষ সাক্ষ্য ও কাগজপত্র দাখিল করেন এবং যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায় দেন।
- ডিক্রি জারি। রায়ের পর স্বামী টাকা না দিলে জারি মামলার মাধ্যমে দেনমোহর আদায় করা হয়।
একই মামলায় দেনমোহরের সঙ্গে ভরণপোষণের দাবিও যুক্ত করা যায়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাঁচে। ভরণপোষণ নিয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ বিষয়ক লেখা দেখুন।
সময়সীমা: দেরি করলে অধিকার হারানোর ঝুঁকি
তামাদি আইন ১৯০৮ অনুযায়ী দেনমোহর আদায় মামলার নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। তাৎক্ষণিক দেনমোহরের ক্ষেত্রে স্ত্রী দাবি করার পর স্বামী প্রত্যাখ্যান করলে সাধারণত সেই তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হয়। বিলম্বিত দেনমোহরের ক্ষেত্রে তালাক বা মৃত্যুর মাধ্যমে বিয়ে শেষ হওয়ার পর সাধারণত ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হয়।
সময়সীমা পার হয়ে গেলে আদালত মামলা খারিজ করতে পারেন। তাই তালাকের পর বা দেনমোহর চেয়ে না পাওয়ার পর দেরি না করে দ্রুত আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তালাকের নোটিশ পাওয়ার দিনটি, এবং দেনমোহর চেয়ে পাঠানো চিঠির তারিখ লিখে রাখুন ও কপি সংরক্ষণ করুন। সময়সীমা নিয়ে বিতর্ক হলে এই তারিখগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বামীর সাধারণ আপত্তি ও তার জবাব
দেনমোহর আদায় মামলায় স্বামী পক্ষ প্রায়ই কয়েকটি আপত্তি তোলে:
- "দেনমোহর আগেই পরিশোধ করা হয়েছে।" পরিশোধের দাবি স্বামীকেই প্রমাণ করতে হয়। কাবিননামায় উসুল লেখা অংশ ছাড়া অন্য পরিশোধের লিখিত প্রমাণ না থাকলে এই দাবি দুর্বল।
- "স্ত্রী দেনমোহর মাফ করে দিয়েছেন।" মাফ স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে হতে হবে। চাপ, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া মাফ আদালত গ্রহণ করেন না।
- "দেনমোহরের পরিমাণ অবাস্তব।" কাবিননামায় যে পরিমাণ লেখা আছে, স্বামী তা স্বাক্ষর করে মেনে নিয়েছেন। সাধারণত আদালত লিখিত পরিমাণই বহাল রাখেন।
- "মামলা তামাদি হয়ে গেছে।" এখানে দাবি ও প্রত্যাখ্যানের তারিখ এবং তালাক কার্যকর হওয়ার তারিখ গুরুত্বপূর্ণ।
রায়ের পর টাকা আদায়: ডিক্রি জারি
রায়ে জয়ী হওয়াই শেষ কথা নয়; আসল লক্ষ্য দেনমোহর আদায় করে টাকা হাতে পাওয়া। স্বামী স্বেচ্ছায় টাকা না দিলে স্ত্রী একই আদালতে জারি মামলা করতে পারেন। আদালত স্বামীর সম্পত্তি ক্রোক ও বিক্রি, বেতন থেকে কর্তন বা অন্যান্য আইনসম্মত উপায়ে টাকা আদায়ের আদেশ দিতে পারেন। আইন আদালতকে কিস্তিতে পরিশোধের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতাও দিয়েছে, এবং কিস্তি খেলাপ হলে বাকি টাকা একসঙ্গে আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
স্বামী বিদেশে থাকলে বা সম্পত্তি গোপন করলে জারি প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে। এক্ষেত্রে স্বামীর সম্পত্তি, ব্যাংক হিসাব ও কর্মস্থলের তথ্য সংগ্রহ করা দেনমোহর আদায়ে বড় সহায়তা করে।
আপিল ও পরবর্তী প্রতিকার
পারিবারিক আদালতের রায়ে কোনো পক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জেলা জজ আদালতে আপিল করা যায়। আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণের কম দেনমোহরের ডিক্রির ক্ষেত্রে আপিলের সুযোগ সীমিত হতে পারে। আপিল চলাকালে ডিক্রি স্থগিত করতে হলে আদালতের আলাদা আদেশ লাগে। তাই রায়ের পর দ্রুত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করুন।
স্বামীর মৃত্যুর পর দেনমোহর আদায়
স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহর স্বামীর ঋণ হিসেবে গণ্য হয়। উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের আগে দাফন-কাফনের খরচ ও অন্যান্য ঋণের সঙ্গে দেনমোহর পরিশোধ করতে হয়। উত্তরাধিকারীরা পরিশোধ না করলে বিধবা স্ত্রী মৃত স্বামীর সম্পত্তি থেকে দেনমোহর আদায় করার জন্য মামলা করতে পারেন। পাশাপাশি তিনি উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজের অংশও পান; দেনমোহর ও উত্তরাধিকারের অংশ আলাদা অধিকার। ওয়ারিশ সনদ ও সম্পত্তি ভাগ নিয়ে জানতে আমাদের ওয়ারিশ সনদ বিষয়ক লেখা পড়ুন।
আপস-মীমাংসা ও বিকল্প পথ
সব দেনমোহর আদায় আদালতের রায় পর্যন্ত গড়ায় না। অনেক ক্ষেত্রে আইনি নোটিশের পর বা আদালতের প্রাক-বিচার মীমাংসা পর্যায়ে স্বামী এককালীন বা কিস্তিতে পরিশোধে রাজি হন। স্থানীয় সালিশ বা জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার মাধ্যমেও আপসের চেষ্টা করা যায়। তবে যেকোনো সমঝোতা লিখিত হওয়া উচিত এবং সম্ভব হলে আদালতের আদেশে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে পরে খেলাপ হলে সহজে জারি করা যায়।
আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (লিগ্যাল এইড) থেকে বিনামূল্যে আইনজীবী পাওয়া যেতে পারে। প্রতিটি জেলায় লিগ্যাল এইড অফিস আছে।
প্রবাসী নারী ও প্রবাসী স্বামী
স্ত্রী বিদেশে থাকলেও পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে বাংলাদেশে দেনমোহর আদায় মামলা পরিচালনা করা যায়। স্বামী বিদেশে থাকলে সমন পাঠানো ও ডিক্রি জারিতে সময় বেশি লাগতে পারে, তবে বাংলাদেশে তার সম্পত্তি থাকলে সেখান থেকে আদায় সম্ভব। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরির নিয়ম জানতে আমাদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিষয়ক লেখাটি দেখুন।

কাবিননামা না থাকলে বা বিয়ে রেজিস্ট্রি না হলে
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন ১৯৭৪ অনুযায়ী প্রতিটি মুসলিম বিয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। তবু বাস্তবে অনেক বিয়ে নিবন্ধন ছাড়াই হয়, অথবা কাবিননামা হারিয়ে যায়। এর মানে এই নয় যে স্ত্রী দেনমোহর আদায় করতে পারবেন না। বিয়ে নিবন্ধিত হয়ে থাকলে রেজিস্ট্রারের বালাম বই থেকে সার্টিফায়েড কপি তোলা যায়।
বিয়ে নিবন্ধিত না হলে সাক্ষী, বিয়ের ছবি, দাওয়াতপত্র, একসঙ্গে বসবাসের প্রমাণ এবং অন্যান্য কাগজের মাধ্যমে বিয়ে ও দেনমোহরের পরিমাণ প্রমাণ করতে হয়। পরিমাণ প্রমাণ করা না গেলে আদালত যুক্তিসঙ্গত দেনমোহর নির্ধারণ করতে পারেন। এ ধরনের মামলায় শক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ সাজানো খুব জরুরি, তাই অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাহায্য নিয়ে দেনমোহর আদায় করার পরিকল্পনা করুন।
দেনমোহর ও যৌতুকের পার্থক্য
অনেকে দেনমোহর ও যৌতুককে গুলিয়ে ফেলেন, কিন্তু দুটি সম্পূর্ণ আলাদা। দেনমোহর স্বামী স্ত্রীকে দেন, এবং এটি আইনসম্মত ও বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে যৌতুক হলো বিয়ের শর্ত হিসেবে কনে পক্ষের কাছ থেকে টাকা বা জিনিস দাবি করা, যা যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। কনে পক্ষ বিয়েতে যে উপহার বা গয়না দেয়, তা দেনমোহরের অংশ নয়। আবার স্বামী পক্ষের দেওয়া গয়না কাবিননামায় উসুল হিসেবে লেখা থাকলে তা দেনমোহরের পরিশোধিত অংশ হিসেবে গণ্য হতে পারে। হিসাব করার সময় এই পার্থক্যগুলো মাথায় রাখুন।
মামলার খরচ ও সময়
পারিবারিক আদালতে দেনমোহর আদায় মামলার কোর্ট ফি নির্ধারিত এবং অন্যান্য দেওয়ানি মামলার তুলনায় কম। মূল খরচ হলো আইনজীবীর ফি, নোটিশ ও কাগজপত্র তোলার খরচ এবং যাতায়াত। আইনে পারিবারিক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্য রাখা হলেও বাস্তবে আদালতের মামলাজট, সমন জারিতে দেরি ও বারবার শুনানি মুলতবির কারণে সময় বেশি লাগতে পারে।
সময় কমাতে কয়েকটি বিষয় সাহায্য করে: শুরু থেকেই সম্পূর্ণ কাগজপত্র জমা দেওয়া, স্বামীর সঠিক ঠিকানা দেওয়া, প্রতিটি তারিখে উপস্থিত থাকা এবং সাক্ষীদের প্রস্তুত রাখা। মীমাংসা পর্যায়ে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব বিবেচনা করলেও দ্রুত দেনমোহর আদায় করা সম্ভব হয়।
মামলা চলাকালে যে বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
- আদালতের বাইরে চাপ দিয়ে কোনো কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা হলে স্বাক্ষর করবেন না; আইনজীবীকে জানান।
- স্বামী সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর করছেন বলে জানলে দ্রুত আদালতকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় আদেশ চাওয়ার বিষয়ে পরামর্শ নিন।
- আংশিক টাকা পেলে লিখিত রসিদ দিন ও নিন, যাতে বকেয়া হিসাব নিয়ে বিতর্ক না হয়।
- সামাজিক মাধ্যমে মামলা নিয়ে মন্তব্য বা স্বামী পক্ষের সঙ্গে উত্তেজিত বার্তা বিনিময় এড়িয়ে চলুন।
- সব নোটিশ, আদেশ ও কাগজের কপি একটি ফাইলে গুছিয়ে রাখুন।
সতর্কতার সঙ্গে মামলা পরিচালনা করলে দেনমোহর আদায় করার পথ অনেক সহজ হয়।
একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝি
ধরা যাক, রুমানার কাবিননামায় দেনমোহর পাঁচ লাখ টাকা লেখা আছে, যার মধ্যে এক লাখ টাকার গয়না উসুল দেখানো হয়েছে। বাকি চার লাখ টাকা কীভাবে পরিশোধ হবে তা কাবিননামায় স্পষ্ট লেখা নেই। বিয়ের তিন বছর পর স্বামী তাকে তালাক দেন এবং দেনমোহরের কথা এড়িয়ে যান। এক্ষেত্রে রুমানা প্রথমে লিখিতভাবে চার লাখ টাকা দাবি করবেন, আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ দেবেন এবং সাড়া না পেলে নিজের এলাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করবেন। একই মামলায় তিনি ইদ্দতকালীন ভরণপোষণও দাবি করতে পারেন।
মামলায় স্বামী যদি দাবি করেন যে তিনি নগদে টাকা দিয়েছেন কিন্তু কোনো রসিদ দেখাতে না পারেন, আদালত সাধারণত কাবিননামার লেখাকেই গুরুত্ব দেবেন। রায়ের পর স্বামী টাকা না দিলে রুমানা জারি মামলা করে দেনমোহর আদায় করতে পারবেন। এই উদাহরণটি কাল্পনিক, তবে বাস্তবে অনেক মামলা ঠিক এভাবেই এগোয়।
নারীদের জন্য কয়েকটি পরামর্শ
বিয়ের সময়ই কাবিননামা মনোযোগ দিয়ে পড়ুন এবং দেনমোহরের পরিমাণ, উসুলের হিসাব ও পরিশোধের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে কি না দেখুন। কাবিননামার একটি কপি নিজের কাছে রাখুন এবং নিকাহ রেজিস্ট্রারের নাম-ঠিকানা লিখে রাখুন। দাম্পত্য জীবনে সমস্যা শুরু হলে আবেগের বশে কোনো কাগজে স্বাক্ষর করবেন না। আর তালাক বা বিচ্ছেদের সম্ভাবনা দেখা দিলে শুরুতেই আইনজীবীর পরামর্শ নিন, যাতে দেনমোহর আদায় এবং ভরণপোষণসহ সব অধিকার সময়মতো সুরক্ষিত থাকে।
হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের নারীদের ক্ষেত্রে
দেনমোহর মুসলিম পারিবারিক আইনের বিষয়। হিন্দু, খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মাবলম্বী নারীদের বিয়েতে দেনমোহরের ধারণা নেই; তাদের ভরণপোষণ, স্ত্রীধন ও সম্পত্তির অধিকার নিজ নিজ ব্যক্তিগত আইন ও প্রাসঙ্গিক আইনে নির্ধারিত হয়। তবে পারিবারিক আদালত ধর্ম নির্বিশেষে ভরণপোষণ, অভিভাবকত্ব ও সন্তানের হেফাজতের মতো বিষয়ে মামলা শুনতে পারেন। আন্তঃধর্মীয় বা বিশেষ বিবাহ আইনে হওয়া বিয়ের ক্ষেত্রে কোন আইন প্রযোজ্য তা আলাদাভাবে যাচাই করে নিতে হয়। নিজের পরিস্থিতিতে কোন অধিকার প্রযোজ্য, তা জানতে একজন পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
দেনমোহর আদায় নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
বিয়ে চলমান অবস্থায় কি দেনমোহর দাবি করা যায়?
হ্যাঁ। তাৎক্ষণিক দেনমোহর স্ত্রী যেকোনো সময় দাবি করতে পারেন, এবং কাবিননামায় পদ্ধতি লেখা না থাকলে পুরো দেনমোহর চাহিবামাত্র পরিশোধযোগ্য।
স্ত্রী তালাক দিলে কি দেনমোহর পাবেন?
সাধারণত হ্যাঁ। তালাকে তাফয়ীজ বা আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদে দেনমোহরের অধিকার থাকে; খুলার ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত দেখতে হয়।
দেনমোহর মামলা কোথায় করতে হয়?
পারিবারিক আদালতে, সাধারণত স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করেন সেই এলাকার আদালতে।
কত দিনের মধ্যে মামলা করতে হবে?
সাধারণত দাবি প্রত্যাখ্যানের বা তালাক কিংবা মৃত্যুর পর ৩ বছরের মধ্যে। দেরি করলে মামলা তামাদি হয়ে যেতে পারে।
বিয়ের দিন মাফ করে দেওয়া দেনমোহর কি আদায় করা যায়?
চাপ বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া মাফ আইনে গ্রহণযোগ্য নয়। পরিস্থিতি প্রমাণ করতে পারলে দেনমোহর আদায় সম্ভব।
স্বামী রায়ের পরও টাকা না দিলে কী করবেন?
জারি মামলা করুন। আদালত সম্পত্তি ক্রোক, বেতন কর্তন বা অন্যান্য উপায়ে আদায়ের আদেশ দিতে পারেন।
আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি
আমরা দেনমোহর আদায় সংক্রান্ত সব ধাপে নারীদের সহায়তা করি: কাবিননামা ও প্রমাণ সংগ্রহ, আইনি নোটিশ, পারিবারিক আদালতে মামলা, মীমাংসা আলোচনা, ডিক্রি জারি এবং আপিল। প্রবাসী মক্কেলদের জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থাও আছে। ব্যারিস্টার মেহেরুবা মাহবুব সম্পর্কে জানতে আমাদের পরিচিতি পাতা দেখুন।
দেনমোহর পাচ্ছেন না?
আপনার কাবিননামা ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আমরা দ্রুত ও কার্যকর আইনি পথ দেখাব।
পরামর্শ বুক করুনআমাদের সম্পর্কেপ্রাথমিক উৎস: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ ও তামাদি আইন ১৯০৮, বাংলাদেশ আইন পোর্টাল; বিনামূল্যে আইনি সহায়তার তথ্য, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা।
এই লেখাটি অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের পারিবারিক আইন সম্পর্কে সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। কোর্ট ফি, সময়সীমা ও আপিলের নিয়ম পরিবর্তন হতে পারে; পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।



0 Comments