Meheruba Mahbub — Global Header Mega Menu

জমি রেজিস্ট্রি খরচ: 7টি উপাদানে হিসাবের সহজ ও নির্ভরযোগ্য গাইড 2026

by Barrister Meheruba Mahbub | Oct 24, 2026 | Bangladesh Law, Land Law | 0 comments

জমি রেজিস্ট্রি খরচ কোনো একক ফি নয়; এটি কয়েকটি আলাদা সরকারি পাওনার যোগফল: স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর, উৎসে কর এবং কয়েকটি ছোট ফি। প্রতিটির ভিত্তি আলাদা আইন, আর হার বদলায় অর্থ আইন ও সরকারি প্রজ্ঞাপনে। কীভাবে হিসাব করবেন, এখানে ধাপে ধাপে বলছি।

জমি রেজিস্ট্রি খরচ — স্ট্যাম্প শুল্ক, ফি ও উৎসে করের গাইড
মূল বিষয়গুলো
  • সাফকবলা দলিলে খরচের প্রধান অংশ চারটি: স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর এবং আয়কর আইনের অধীনে উৎসে কর।
  • প্রথম তিনটি সাধারণত দলিল মূল্যের শতাংশ হিসেবে, আর উৎসে কর জমির অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারিত হারে হিসাব হয়।
  • দলিল মূল্য মৌজার সর্বনিম্ন বাজারমূল্যের চেয়ে কম দেখানো যায় না; কম দেখালে দলিল আটকে যেতে পারে।
  • হার প্রায় প্রতি বছর অর্থ আইনে বা প্রজ্ঞাপনে বদলায়, তাই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা সরকারি সূত্র থেকে চলতি তালিকা যাচাই করে নিন।
  • হেবা, বণ্টননামা ও আমমোক্তারনামার মতো দলিলে খরচের কাঠামো সাফকবলা থেকে আলাদা।

জমি রেজিস্ট্রি খরচ আসলে কী

জমি কেনাবেচায় দলিল সম্পাদনের পর তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধন করতে হয়। রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নিবন্ধন না হলে আইনের চোখে মালিকানা হস্তান্তর সম্পূর্ণ হয় না, আর পরে নামজারি (mutation) করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

নিবন্ধনের সময় সরকারকে যে টাকা দিতে হয়, সাধারণ মানুষ তাকেই জমি রেজিস্ট্রি খরচ বলেন। বাস্তবে এর মধ্যে কয়েকটি আলাদা পাওনা থাকে, যেগুলো ভিন্ন ভিন্ন আইনের অধীনে আদায় হয় এবং ভিন্ন সরকারি খাতে জমা পড়ে। তাই একটি সংখ্যা মুখস্থ না করে প্রতিটি উপাদান আলাদাভাবে বোঝা জরুরি।

এই লেখায় আমরা কোনো নির্দিষ্ট শতাংশ হার দিচ্ছি না। কারণ জমি রেজিস্ট্রি খরচ-এর হারগুলো অর্থ আইন ও সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বারবার বদলেছে, এমনকি ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও পরিবর্তনের খবর এসেছে। আমরা দেখাচ্ছি কোন উপাদান কীভাবে হিসাব হয়, আর চলতি হার কোথা থেকে নিশ্চিত হবেন।

কোন আইন থেকে কোন খরচ আসে

স্ট্যাম্প শুল্ক আসে স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯ থেকে। রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারিত হয় রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর অধীনে সরকারের জারি করা ফি তালিকা অনুযায়ী। স্থানীয় সরকার কর আসে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ সংক্রান্ত স্থানীয় সরকার আইন থেকে। আর উৎসে কর বা লাভ কর আদায় হয় আয়কর আইন, ২০২৩-এর অধীনে।

জমি রেজিস্ট্রি খরচ-এর প্রধান উপাদানসমূহ

নিচের সারণিতে একটি সাধারণ সাফকবলা দলিলের খরচের উপাদানগুলো দেখানো হলো। হার ইচ্ছাকৃতভাবে দেওয়া হয়নি; প্রতিটির হিসাবের ভিত্তি ও উৎস দেখানো হয়েছে।

উপাদানআইনি ভিত্তিসাধারণ হিসাবের ভিত্তি
স্ট্যাম্প শুল্কস্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯ (অর্থ আইনে সংশোধিত)দলিল মূল্যের নির্ধারিত শতাংশ
রেজিস্ট্রেশন ফিরেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ ও সরকারি ফি তালিকাদলিল মূল্যের শতাংশ বা দলিলভেদে নির্দিষ্ট অঙ্ক
স্থানীয় সরকার করসংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার আইনদলিল মূল্যের শতাংশ, এলাকাভেদে ভিন্ন
উৎসে কর (লাভ কর)আয়কর আইন, ২০২৩জমির অবস্থান অনুযায়ী শতাংশ বা আয়তনভিত্তিক নির্ধারিত অঙ্ক
ই-ফি, এন-ফি ও নকল ফিনিবন্ধন সংক্রান্ত বিধি ও প্রজ্ঞাপনপৃষ্ঠা বা দলিলপ্রতি নির্দিষ্ট অঙ্ক
হলফনামা ও কোর্ট ফি স্ট্যাম্পস্ট্যাম্প আইন ও কোর্ট ফি আইননির্দিষ্ট মূল্যের স্ট্যাম্প
মূল্য সংযোজন কর (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২নির্দিষ্ট ধরনের সম্পত্তি বা লেনদেনে

স্ট্যাম্প শুল্ক: দলিল মূল্যের ওপর প্রথম খরচ

সাফকবলা দলিল লেখা হয় নির্ধারিত মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে বা স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধের প্রমাণসহ। স্ট্যাম্প আইনের তফসিলে হস্তান্তর দলিলের (conveyance) জন্য শুল্কের হার দেওয়া থাকে, যা বিভিন্ন অর্থ আইনে সংশোধিত হয়েছে।

স্ট্যাম্প শুল্ক সাধারণত দলিলে উল্লিখিত মূল্যের ওপর শতাংশ হিসেবে ধরা হয়। দলিল মূল্য যত বেশি, শুল্কও তত বেশি। এর একটি অংশ সাধারণত স্ট্যাম্প পেপারে, বাকি অংশ ব্যাংকে পে-অর্ডার বা চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়।

কম স্ট্যাম্প দেওয়ার পরিণতি

যথাযথ স্ট্যাম্প ছাড়া সম্পাদিত দলিল সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে, এবং ঘাটতি শুল্কের সঙ্গে জরিমানাও দিতে হতে পারে। তাই জমি রেজিস্ট্রি খরচ কমাতে স্ট্যাম্প কম দেওয়ার চেষ্টা উল্টো বিপদ ডেকে আনে।

রেজিস্ট্রেশন ফি কীভাবে নির্ধারিত হয়

রেজিস্ট্রেশন ফি সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে দলিল নিবন্ধনের জন্য দেওয়া সরকারি ফি। সাফকবলা দলিলে এটি সাধারণত দলিল মূল্যের একটি শতাংশ। সরকার রেজিস্ট্রেশন আইনের ক্ষমতাবলে ফি তালিকা জারি করে এবং প্রয়োজন হলে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তা বদলায়।

সব দলিলে একই হারে ফি লাগে না। কিছু দলিলে, বিশেষ করে নিকট আত্মীয়দের মধ্যে হেবা বা দানপত্রে, শতাংশের বদলে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের ফি নির্ধারিত আছে। বণ্টননামা, বন্ধক দলিল ও আমমোক্তারনামার জন্যও আলাদা কাঠামো রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ টিপস

দলিল লেখার আগেই সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নোটিশ বোর্ড বা অফিস থেকে চলতি ফি তালিকা দেখে নিন, এবং দলিল লেখককে প্রতিটি অঙ্কের লিখিত হিসাব দিতে বলুন। মুখে বলা মোট অঙ্কের ওপর ভরসা করবেন না।

স্থানীয় সরকার কর: এলাকাভেদে ভিন্ন হার

জমি হস্তান্তরের সময় সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে একটি কর আদায় করা হয়, যা স্থানীয় সরকার কর নামে পরিচিত। এটি সাধারণত দলিল মূল্যের শতাংশ হিসেবে ধরা হয়, এবং শহর ও গ্রামাঞ্চলে হার আলাদা হতে পারে।

এই কর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে পে-অর্ডার বা চালানে জমা হয় এবং পরে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তহবিলে যায়। জমি কোন প্রশাসনিক এলাকায় পড়েছে, তা ঠিকভাবে না জানলে জমি রেজিস্ট্রি খরচ ভুল হিসাব হতে পারে।

সিটি কর্পোরেশন ও পৌর এলাকার সীমানা

অনেক সময় নতুন সম্প্রসারিত এলাকা সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকে। মৌজাটি বর্তমানে কোন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আওতায়, তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা উপজেলা ভূমি অফিস থেকে নিশ্চিত হোন।

জমি রেজিস্ট্রি খরচ হিসাবের ধাপসমূহ
দলিল করার আগে খরচ হিসাবের একটি বাস্তবসম্মত ক্রম

উৎসে কর: জমি রেজিস্ট্রি খরচ-এর সবচেয়ে বড় অংশ

অনেক এলাকায় জমি রেজিস্ট্রি খরচ-এর সবচেয়ে বড় অংশ হলো উৎসে কর। জমি বা ভবন হস্তান্তর থেকে বিক্রেতার যে মূলধনী লাভ হয়, তার ওপর আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী নিবন্ধনের সময়ই কর আদায় করা হয়। সাব-রেজিস্ট্রার এই কর পরিশোধের প্রমাণ ছাড়া দলিল নিবন্ধন করেন না।

উৎসে করের হার জমির অবস্থান অনুযায়ী আলাদা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট অভিজাত এলাকা, অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা সদর এবং বাকি এলাকার জন্য ভিন্ন ভিন্ন হার রয়েছে। কিছু এলাকায় কাঠা বা শতাংশপ্রতি নির্দিষ্ট অঙ্ক, আবার কিছু ক্ষেত্রে দলিল মূল্যের শতাংশ প্রযোজ্য।

সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়ে সতর্কতা

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে উৎসে করের হার এলাকাভেদে কমানো এবং কাঠার বদলে শতাংশভিত্তিক হিসাব চালুর প্রস্তাবের খবর গণমাধ্যমে এসেছিল, এবং ২০২৬ সালে নতুন অর্থ আইনও পাস হয়েছে। চূড়ান্ত হার কী, তা আমরা কোনো চলতি সরকারি সূত্র থেকে যাচাই করতে পারিনি। তাই রেজিস্ট্রির আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে চলতি হার নিশ্চিত করুন।

উৎসে কর কে দেবেন

আইনের দৃষ্টিতে এই কর বিক্রেতার আয়ের ওপর কর, এবং বিক্রেতা তা তাঁর আয়কর রিটার্নে সমন্বয়ের সুযোগ পেতে পারেন। তবে বাস্তবে অনেক সময় ক্রেতাই পুরো জমি রেজিস্ট্রি খরচ বহন করেন। কে কোন খরচ দেবেন, তা বায়নানামায় স্পষ্ট লিখে রাখুন, নইলে শেষ মুহূর্তে বিরোধ হয়।

মৌজা মূল্য ও দলিল মূল্য: হিসাবের ভিত্তি

জমি রেজিস্ট্রি খরচ-এর প্রায় সব উপাদান দলিল মূল্যের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু দলিল মূল্য ইচ্ছেমতো কম দেখানো যায় না। সরকার প্রতিটি মৌজার জমির শ্রেণি অনুযায়ী একটি সর্বনিম্ন বাজারমূল্য নির্ধারণ করে, যা সাধারণত মৌজা মূল্য নামে পরিচিত।

দলিলে উল্লিখিত মূল্য মৌজা মূল্যের চেয়ে কম হলে সাধারণত দলিল নিবন্ধন করা যায় না, অথবা মৌজা মূল্যের ভিত্তিতে খরচ দিতে হয়। আবার প্রকৃত বিক্রয়মূল্য মৌজা মূল্যের চেয়ে বেশি হলে আইনত প্রকৃত মূল্যই দলিলে লেখা উচিত।

কম মূল্য দেখানোর ঝুঁকি

খরচ বাঁচাতে দলিলে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম দেখানো বহুল প্রচলিত, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ক্রেতার কেনা সম্পদের বৈধ উৎস ও মূল্য আয়কর রিটার্নে দেখাতে সমস্যা হয়, পরে বিক্রির সময় মূলধনী লাভ বেশি দেখায়, আর অগ্রক্রয় (pre-emption) মামলায় ক্ষতিপূরণের হিসাবেও জটিলতা তৈরি হয়।

জমির শ্রেণিও গুরুত্বপূর্ণ। নাল, ভিটি, বাণিজ্যিক বা আবাসিক শ্রেণিভেদে মৌজা মূল্য ভিন্ন হয়। খতিয়ান ও সরেজমিন অবস্থার মধ্যে শ্রেণির অমিল থাকলে আগে তা পরিষ্কার করুন।

মৌজা মূল্যও স্থির নয়। সরকার সময়ে সময়ে মৌজাভিত্তিক সর্বনিম্ন বাজারমূল্য হালনাগাদ করে, এবং প্রতি বছর তা পর্যালোচনার উদ্যোগের খবরও এসেছে। ফলে গত বছর যে মূল্যে প্রতিবেশী দলিল করেছেন, এ বছর একই মৌজায় সেই মূল্য প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। দলিল লেখার আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে আপনার মৌজা ও জমির শ্রেণির চলতি সর্বনিম্ন মূল্য লিখিতভাবে জেনে নিন, কারণ জমি রেজিস্ট্রি খরচ-এর প্রায় সব অঙ্ক এই মূল্যের ওপর দাঁড়ায়।

জমি রেজিস্ট্রি খরচ হিসাবের ধাপে ধাপে পদ্ধতি

নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করলে দলিল লেখকের দেওয়া হিসাব নিজেই যাচাই করতে পারবেন।

  1. দলিলের ধরন ঠিক করুন। সাফকবলা, হেবা, এওয়াজ, বণ্টননামা নাকি অন্য দলিল, তা আগে নির্ধারণ করুন, কারণ খরচের কাঠামো দলিলভেদে আলাদা।
  2. দলিল মূল্য নির্ধারণ করুন। প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ও মৌজার সর্বনিম্ন মূল্য তুলনা করুন; যেটি বেশি, সেটিই সাধারণত হিসাবের ভিত্তি হবে।
  3. চলতি হার সংগ্রহ করুন। সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন বা সরকারি দলিল ফি ক্যালকুলেটর থেকে প্রতিটি উপাদানের হার নিন।
  4. শতাংশভিত্তিক অংশ হিসাব করুন। দলিল মূল্যকে স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি ও স্থানীয় সরকার করের হার দিয়ে আলাদাভাবে গুণ করুন।
  5. উৎসে কর হিসাব করুন। জমির এলাকা অনুযায়ী প্রযোজ্য হার বা আয়তনভিত্তিক অঙ্ক বের করুন।
  6. নির্দিষ্ট ফি যোগ করুন। ই-ফি, এন-ফি, নকল ফি, হলফনামা ও কোর্ট ফি স্ট্যাম্পের অঙ্ক যোগ করুন।
  7. টাকা জমা ও রশিদ সংরক্ষণ। নির্ধারিত ব্যাংকে পে-অর্ডার বা চালানে টাকা জমা দিন এবং প্রতিটি রশিদের কপি নিজের কাছে রাখুন।

একটি সহজ সূত্র

সংক্ষেপে বলা যায়: মোট জমি রেজিস্ট্রি খরচ = দলিল মূল্য × (স্ট্যাম্প শুল্কের হার + রেজিস্ট্রেশন ফির হার + স্থানীয় সরকার করের হার) + উৎসে কর + নির্দিষ্ট ছোট ফিসমূহ। প্রতিটি হার আলাদাভাবে চলতি তালিকা থেকে বসাতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে ধরুন, একটি জমির দলিল মূল্য দশ লাখ টাকা। প্রথমে দশ লাখকে তিনটি শতাংশ হারের প্রতিটি দিয়ে গুণ করে তিনটি অঙ্ক পাবেন। তারপর জমি যে এলাকায় অবস্থিত, সেই এলাকার উৎসে করের হার বা আয়তনভিত্তিক অঙ্ক যোগ করবেন। সবশেষে ছোট ফিগুলো যোগ করলে মোট অঙ্ক দাঁড়াবে।

দলিলের ধরনভেদে খরচের পার্থক্য

সব দলিলে একই জমি রেজিস্ট্রি খরচ লাগে না। নিচে প্রধান কয়েকটি দলিলের পার্থক্য তুলে ধরা হলো।

  • সাফকবলা (বিক্রয় দলিল)। সব প্রধান উপাদান প্রযোজ্য: স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর ও উৎসে কর।
  • হেবা বা দানপত্র। স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা ও সন্তান, ভাই-বোনসহ আইনে উল্লিখিত নিকট আত্মীয়দের মধ্যে হেবার ক্ষেত্রে সাধারণত নির্দিষ্ট অল্প অঙ্কের ফি প্রযোজ্য, শতাংশভিত্তিক নয়। সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে হলফনামা লাগে।
  • বণ্টননামা। সহ-শরিকদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগের দলিলে খরচের কাঠামো আলাদা, এবং প্রায়ই সাফকবলার চেয়ে কম।
  • এওয়াজ বা বিনিময় দলিল। দুই পক্ষের জমি বিনিময়ে মূল্যায়নের ভিত্তিতে খরচ নির্ধারিত হয়।
  • আমমোক্তারনামা। জমি বিক্রির ক্ষমতা দেওয়া আমমোক্তারনামার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, এবং এর জন্য আলাদা স্ট্যাম্প ও ফি লাগে।

প্রবাসীরা বিদেশ থেকে আমমোক্তারনামা দিতে চাইলে দূতাবাসে সত্যায়ন ও দেশে আসার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। বিস্তারিত জানতে আমাদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি গাইড দেখুন।

রেজিস্ট্রির আগে যেসব কাগজ ও পরিশোধ লাগে

জমি রেজিস্ট্রি খরচ জমা দেওয়ার আগেই কিছু কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হয়। বিক্রেতার মালিকানার প্রমাণ হিসেবে মূল দলিল ও বায়া দলিল, হালনাগাদ খতিয়ান, নামজারির ডিসিআর এবং ভূমি উন্নয়ন করের রশিদ লাগে। ভূমি উন্নয়ন কর এখন অনলাইনে ldtax.gov.bd থেকে পরিশোধ ও রশিদ সংগ্রহ করা যায়।

উভয় পক্ষের জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ (PSR) প্রয়োজন হতে পারে। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী নির্দিষ্ট মূল্যের বেশি সম্পত্তি নিবন্ধনে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

সময়সীমা মনে রাখুন

রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী দলিল সম্পাদনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা নিবন্ধনের জন্য দাখিল করতে হয়। দেরি হলে জরিমানা লাগতে পারে বা নিবন্ধন জটিল হয়ে যায়। পুরো প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ আমাদের জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়ার গাইডে পাবেন।

জমি রেজিস্ট্রি খরচ — মূল তথ্য এক নজরে
জমি রেজিস্ট্রির খরচ যে আইনগুলো থেকে আসে

সরকারি পাওনার বাইরে যেসব খরচ বাজেটে রাখবেন

সরকারি জমি রেজিস্ট্রি খরচ-এর বাইরেও একটি জমি কেনায় আরও কিছু ব্যয় থাকে, যা অনেকে শুরুতে হিসাবে রাখেন না। এগুলো সরকারি পাওনা নয়, তাই কোনো নির্দিষ্ট সরকারি হার নেই; পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা বা সেবাদাতার সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

  • দলিল লেখকের পারিশ্রমিক। লাইসেন্সপ্রাপ্ত দলিল লেখক দলিল প্রস্তুত করেন। তাঁর পারিশ্রমিক আগে থেকে লিখিতভাবে ঠিক করে নিন, এবং সরকারি পাওনা থেকে আলাদা করে রশিদ নিন।
  • আইনজীবীর ফি। মালিকানা যাচাই, বায়নানামা ও দলিলের খসড়া পর্যালোচনার জন্য আইনজীবীর ফি একটি বিনিয়োগ, যা পরে বড় ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারে।
  • জরিপ ও সীমানা নির্ধারণ। জমির সীমানা ও আয়তন মাপতে সার্ভেয়ারের খরচ লাগতে পারে, বিশেষ করে যেখানে দাগ ও খতিয়ানের সঙ্গে সরেজমিন অবস্থার অমিল আছে।
  • সার্টিফায়েড কপি ও তল্লাশি। বায়া দলিলের সার্টিফায়েড কপি তোলা এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাশির জন্যও নির্ধারিত ফি লাগে।
  • ব্যাংক চার্জ। পে-অর্ডার ও চালান তৈরির জন্য ব্যাংক সামান্য চার্জ নিতে পারে।

আমরা সাধারণত ক্লায়েন্টদের পরামর্শ দিই, মোট বাজেটে সরকারি জমি রেজিস্ট্রি খরচ-এর পাশাপাশি এই আনুষঙ্গিক ব্যয় ও নামজারির খরচের জন্যও আলাদা একটি অংশ রাখতে। এতে শেষ মুহূর্তে টাকার ঘাটতিতে রেজিস্ট্রি পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।

কোম্পানি ও প্রবাসীদের জন্য বিশেষ বিবেচনা

কোনো কোম্পানি জমি কিনলে বা বিক্রি করলে ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য উপাদানগুলোর পাশাপাশি কিছু বাড়তি আনুষ্ঠানিকতা থাকে। কোম্পানির পক্ষে দলিলে সই করার জন্য পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত (বোর্ড রেজল্যুশন) এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুমোদনপত্র লাগে। কোম্পানির নিবন্ধন সনদ ও সংঘস্মারকের কপিও সাধারণত চাওয়া হয়।

কোম্পানির ক্ষেত্রে উৎসে কর এবং পরে আয়কর রিটার্নে তার সমন্বয় কীভাবে হবে, তা প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিভাগের সঙ্গে আগে থেকে পরিকল্পনা করা উচিত। জমি যদি ব্যবসার মূলধনী সম্পদ হয়, তবে হিসাবের খাতায় তা কীভাবে দেখানো হবে, সেটিও খরচের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে

বিদেশে থাকা অবস্থায় জমি কিনতে বা বিক্রি করতে হলে সাধারণত দেশে থাকা কাউকে আমমোক্তারনামা দিতে হয়। এই আমমোক্তারনামার জন্য আলাদা স্ট্যাম্প ও ফি লাগে, এবং দেশে আসার পর নির্ধারিত নিয়মে তা প্রত্যয়ন ও নিবন্ধন করতে হয়। ফলে প্রবাসীদের মোট জমি রেজিস্ট্রি খরচ-এ এই অতিরিক্ত ধাপের খরচও যোগ হয়।

বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থে জমি কিনলে সেই অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আনা হয়েছে, তার প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। ভবিষ্যতে আয়কর রিটার্নে সম্পদের উৎস দেখাতে এবং প্রয়োজনে সম্পত্তি বিক্রির অর্থ বিদেশে নিতে এই কাগজপত্র কাজে লাগে।

জমি রেজিস্ট্রি খরচ নিয়ে সাধারণ ভুল

আমাদের অভিজ্ঞতায় যেসব ভুল সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, সেগুলো হলো:

  • মুখে বলা মোট অঙ্ক। দলিল লেখক বা দালালের দেওয়া এক অঙ্কের হিসাব না ভেঙে মেনে নেওয়া।
  • পুরোনো হার। আগের বছরের হার বা পরিচিত কারও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হিসাব করা।
  • নগদে টাকা দেওয়া। সরকারি পাওনা পে-অর্ডার বা চালানের বদলে কারও হাতে নগদ দেওয়া, যার রশিদ পাওয়া যায় না।
  • ভুল এলাকা। জমির প্রশাসনিক এলাকা ভুল ধরে উৎসে কর বা স্থানীয় সরকার কর হিসাব করা।
  • বায়নানামায় অস্পষ্টতা। কোন খরচ কে দেবেন, তা লিখিত না রাখা।
  • নামজারির খরচ ভুলে যাওয়া। রেজিস্ট্রির পর নামজারির ফি ও সময় বাজেটে না রাখা।
সতর্কতা

সরকারি পাওনার প্রতিটি অঙ্ক ব্যাংক চালান বা পে-অর্ডারে জমা হওয়া উচিত, এবং রশিদের নম্বর দলিলে উল্লেখ থাকে। রশিদ ছাড়া কাউকে টাকা দেবেন না।

রেজিস্ট্রির পর: নামজারি ও অন্যান্য খরচ

দলিল নিবন্ধনের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তর হয়, কিন্তু সরকারি রেকর্ডে নাম তুলতে নামজারি করতে হয়। নামজারির আবেদন এখন অনলাইনে করা যায় এবং এর জন্য আলাদা আবেদন ফি ও নোটিশ ফি লাগে। তাই মোট বাজেটে জমি রেজিস্ট্রি খরচ-এর পাশাপাশি নামজারির খরচও রাখুন।

ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট কিনলে ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি, জমির মালিকের অংশ ও আনুপাতিক জমির হিসাব নিয়ে আলাদা বিষয় থাকে। এ বিষয়ে আমাদের বাড়ি কেনার আইনি প্রক্রিয়া লেখাটি সহায়ক হবে।

আইনজীবীর যাচাই কেন জরুরি

খরচ সঠিক হলেও মালিকানায় ত্রুটি থাকলে পুরো টাকাই ঝুঁকিতে পড়ে। রেজিস্ট্রির আগে আইনজীবী দিয়ে মালিকানার ধারাবাহিকতা, খতিয়ান, নামজারি, দায়দেনা ও মামলা আছে কি না, তা যাচাই করিয়ে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।

জমি রেজিস্ট্রি খরচ নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন

জমি রেজিস্ট্রি খরচ কি ক্রেতা দেন, না বিক্রেতা?

আইনে উৎসে কর বিক্রেতার আয়ের ওপর ধরা হয়, তবে বাস্তবে সাধারণত ক্রেতাই নিবন্ধনের খরচ বহন করেন। কে কোন খরচ দেবেন, তা বায়নানামায় লিখে নেওয়াই ভালো।

এই লেখায় নির্দিষ্ট হার দেওয়া হয়নি কেন?

হারগুলো অর্থ আইন ও সরকারি প্রজ্ঞাপনে প্রায়ই বদলায়, আর আমরা কোনো চলতি সরকারি সূত্র থেকে সর্বশেষ হার যাচাই করতে পারিনি। ভুল হার দেওয়ার চেয়ে হিসাবের পদ্ধতি জানানো বেশি নিরাপদ।

মৌজা মূল্যের চেয়ে কম দামে দলিল করা যায় কি?

সাধারণত না। দলিল মূল্য মৌজার সর্বনিম্ন বাজারমূল্যের চেয়ে কম হলে নিবন্ধন আটকে যেতে পারে বা মৌজা মূল্যের ভিত্তিতে খরচ দিতে হয়।

হেবা দলিলে কি উৎসে কর লাগে?

আইনে নির্ধারিত নিকট আত্মীয়দের মধ্যে হেবায় সাধারণত সাফকবলার মতো শতাংশভিত্তিক খরচ বা উৎসে কর লাগে না, নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়। তবে সম্পর্কের প্রমাণ ও হলফনামা লাগে, তাই চলতি নিয়ম যাচাই করুন।

চলতি হার কোথায় পাব?

সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন এবং সরকারি দলিল ফি ক্যালকুলেটর থেকে চলতি হার জানা যায়। একাধিক সূত্র মিলিয়ে নেওয়া ভালো।

খরচ নগদে দেওয়া যায় কি?

সরকারি পাওনা সাধারণত ব্যাংক চালান বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। নগদে কারও হাতে টাকা দিলে রশিদ পাওয়া যায় না এবং প্রতারণার ঝুঁকি থাকে।

আমরা যেভাবে সাহায্য করতে পারি

আমরা জমি ও ফ্ল্যাট কেনার আগে মালিকানা যাচাই, বায়নানামা ও দলিলের খসড়া, জমি রেজিস্ট্রি খরচ-এর হিসাব যাচাই এবং নিবন্ধন ও নামজারি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা করি। প্রবাসী ক্লায়েন্টদের জন্য আমমোক্তারনামার মাধ্যমেও কাজ করি। বিস্তারিত জানতে আমাদের রিয়েল এস্টেট প্র্যাকটিস দেখুন।

যোগাযোগ করুন

জমি কেনার আগে যাচাই করাতে চান?

আমরা মালিকানা, দলিল ও খরচের হিসাব যাচাই করে নিরাপদে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে সাহায্য করি।

পরামর্শ বুক করুনরিয়েল এস্টেট প্র্যাকটিস

প্রাথমিক সূত্র: রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮, স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯ ও আয়কর আইন, ২০২৩ — বাংলাদেশ আইন পোর্টাল; উৎসে কর সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন — জাতীয় রাজস্ব বোর্ড; ভূমি সেবা — ভূমি মন্ত্রণালয়।

এই লেখাটি ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের আইন সম্পর্কে সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। ফি, কর ও হার অর্থ আইন ও প্রজ্ঞাপনে বদলায়; কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা একজন যোগ্য আইনজীবীর কাছ থেকে চলতি নিয়ম নিশ্চিত করুন।

Written by

Related Posts

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন ফারায়েজ গাইড

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন: 7টি জরুরি নিয়মে ফারায়েজ অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন 2026

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী ফারায়েজের নিয়মে সম্পত্তি বণ্টন: স্বামী, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, বাবা-মা…

read more

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *