প্রবাসীদের জমি কেনা এখন অনেক সহজ, কারণ দেশে না এসেও পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে জমি কেনা, দলিল রেজিস্ট্রি ও নামজারি করানো যায়। তবে ভুলভাবে তৈরি ক্ষমতাপত্র বা যাচাই ছাড়া কেনা জমি বহু প্রবাসীর কষ্টের টাকা ঝুঁকিতে ফেলেছে।

- বিদেশে থাকা অবস্থায় জমি কিনতে হলে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২ ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালা ২০১৫ অনুযায়ী বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটে ক্ষমতাপত্র সম্পাদন ও সত্যায়ন করতে হয়।
- দেশে আসার পর ক্ষমতাপত্রটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিস্বাক্ষর এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্ট্যাম্প শুল্ক দিয়ে প্রত্যয়ন করাতে হয়; সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এটি ছাড়া গ্রহণ করে না।
- ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিধিমালা সংশোধন করে পাসপোর্টের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে; জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনও এখন গ্রহণযোগ্য।
- রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৫২ক অনুযায়ী বিক্রেতার নাম হালনাগাদ খতিয়ানে না থাকলে দলিল রেজিস্ট্রি হবে না, তাই কেনার আগে খতিয়ান যাচাই অপরিহার্য।
- ক্ষমতাপত্রে শুধু প্রয়োজনীয় কাজের ক্ষমতা দিন, টাকা সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে বিক্রেতাকে দিন এবং রেজিস্ট্রির পর দ্রুত নামজারি করান।
প্রবাসীদের জমি কেনা: আইনি কাঠামো এক নজরে
বিদেশে কর্মরত বা বসবাসরত বাংলাদেশিদের বড় একটি স্বপ্ন দেশে নিজের নামে এক টুকরো জমি। কিন্তু ছুটি সীমিত, দেশে আসা ব্যয়বহুল, আর জমি কেনার প্রক্রিয়াও কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে চলে। এই বাস্তবতায় আইন একটি সমাধান দিয়েছে: আপনি বিদেশে বসেই একজন প্রতিনিধিকে (attorney) লিখিত ক্ষমতা দিতে পারেন, যিনি আপনার পক্ষে জমি কিনবেন।
এই ব্যবস্থার মূল আইন পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২ এবং এর অধীনে প্রণীত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালা ২০১৫। এর সঙ্গে প্রযোজ্য রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮, স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ এবং ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩। প্রবাসীদের জমি কেনা নিরাপদ করতে এই আইনগুলোর মূল নিয়ম জানা দরকার।
কেন সাধারণ চিঠি বা অনুমতিপত্র যথেষ্ট নয়
অনেকে মনে করেন, একটি সাধারণ চিঠি বা নোটারি করা অনুমতিপত্র দিয়েই আত্মীয় জমি কিনে দিতে পারবেন। বাস্তবে সাব-রেজিস্ট্রার শুধু আইন অনুযায়ী সম্পাদিত ও প্রত্যয়িত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি গ্রহণ করেন। রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৩৩ অনুযায়ী, বিদেশে বসবাসকারী ব্যক্তির পক্ষে প্রতিনিধি দলিল উপস্থাপন করতে পারেন কেবল তখনই, যখন ক্ষমতাপত্রটি নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের সামনে সম্পাদিত ও সত্যায়িত হয়েছে, যেমন বাংলাদেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেট।
কে কিনতে পারেন: নাগরিকত্ব, পরিচয়পত্র ও অর্থের উৎস
প্রবাসীদের জমি কেনার অধিকার নির্ভর করে নাগরিকত্বের ওপর। বাংলাদেশের নাগরিক যেকোনো দেশে থাকুন, নিজের নামে জমি কিনতে পারেন। যাঁদের দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে, তাঁরাও বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে জমি কিনতে পারেন। তবে যিনি শুধু বিদেশি নাগরিক, বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নেই, তাঁর ক্ষেত্রে নিয়ম ভিন্ন এবং জটিল; সে অবস্থায় কেনার আগে আলাদা আইনি পরামর্শ নিন।
পরিচয়পত্রের নতুন নিয়ম
আগে দূতাবাসে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি করতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রায় অপরিহার্য ছিল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালা ২০১৫ সংশোধন করে এই বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়। এখন জাতীয় পরিচয়পত্র বা অনলাইনে যাচাইযোগ্য জন্মনিবন্ধন সনদও গ্রহণযোগ্য, আর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের ক্ষেত্রে "নো ভিসা রিকোয়ার্ড" স্টিকারসহ বিদেশি পাসপোর্টও চলে।
টাকা কোথা থেকে আসছে
প্রবাসীদের জমি কেনার টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনা সবচেয়ে নিরাপদ। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠালে তা আইনত ঝুঁকিপূর্ণ, আর ভবিষ্যতে আয়কর নথিতে জমির অর্থের উৎস দেখাতে সমস্যা হয়। ব্যাংকের রেমিট্যান্স রসিদ ও বিক্রেতাকে পরিশোধের ব্যাংক রেকর্ড যত্ন করে রাখুন।
যৌথ নামে বা পরিবারের সদস্যের নামে কেনা
অনেক প্রবাসী স্ত্রী, সন্তান বা বাবা-মায়ের সঙ্গে যৌথ নামে জমি কিনতে চান। যৌথ নামে কিনলে দলিলে প্রত্যেকের অংশ স্পষ্টভাবে লেখা উচিত, নইলে পরে অংশ নিয়ে বিরোধ হতে পারে। যাঁরা দেশে আছেন তাঁরা নিজেরা উপস্থিত থাকবেন, আর বিদেশে থাকা ক্রেতার পক্ষে প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন। প্রবাসীদের জমি কেনার সময় মনে রাখবেন, অন্যের নামে কেনা জমি রেকর্ডে তাঁর নামেই থাকে; পরে "বেনামি" দাবি প্রমাণ করে জমি ফেরত পাওয়া কঠিন ও ব্যয়বহুল। তাই নিজের নামে বা স্পষ্ট অংশসহ যৌথ নামে কেনাই নিরাপদ।

পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২ ও বিধিমালা: যা জানা জরুরি
প্রবাসীদের জমি কেনার মূল হাতিয়ার পাওয়ার অব অ্যাটর্নি। এটি একটি লিখিত দলিল, যার মাধ্যমে আপনি (দাতা) অন্য একজনকে (গ্রহীতা বা প্রতিনিধি) আপনার পক্ষে নির্দিষ্ট কাজ করার আইনি ক্ষমতা দেন। প্রতিনিধি যে কাজ ক্ষমতার মধ্যে থেকে করেন, তা আইনত আপনি নিজে করেছেন বলে গণ্য হয়। তাই কাকে, কতটুকু ক্ষমতা দিচ্ছেন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
সাধারণ, বিশেষ ও অপ্রত্যাহারযোগ্য ক্ষমতাপত্র
সাধারণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়, আর বিশেষ পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে নির্দিষ্ট একটি বা কয়েকটি কাজের ক্ষমতা। জমি কেনার জন্য সাধারণত নির্দিষ্ট জমি বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের জন্য বিশেষ ক্ষমতাপত্রই ভালো। আইনে অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বলতে মূলত বিক্রয়, বায়না, ঋণের বিপরীতে বন্ধক বা ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রতিদানের বিনিময়ে দেওয়া ক্ষমতাপত্র বোঝায়, এবং এগুলো রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।
ক্রেতা হিসেবে আপনার ক্ষমতাপত্র সাধারণত প্রত্যাহারযোগ্য। দাতা নির্ধারিত নোটিশ দিয়ে এটি বাতিল করতে পারেন, এবং কাজ সম্পন্ন হলে, মেয়াদ শেষ হলে বা দাতার মৃত্যুতে সাধারণ ক্ষমতাপত্রের কার্যকারিতা শেষ হয়। বিস্তারিত জানতে আমাদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরির গাইড দেখুন।
ক্রয়ের ক্ষমতাপত্রে কী কী লিখবেন
প্রবাসীদের জমি কেনা সফল হবে কি না, তা অনেকটাই ক্ষমতাপত্রের ভাষার ওপর নির্ভর করে। দূতাবাসগুলো সাধারণত সরকার নির্ধারিত ফরম অনুসরণ করতে বলে, তবে ক্ষমতার বিবরণ আপনাকেই ঠিক করতে হয়। অস্পষ্ট বা অতিরিক্ত বিস্তৃত ক্ষমতা ঝুঁকি বাড়ায়, আবার অপূর্ণ ক্ষমতার কারণে সাব-রেজিস্ট্রার দলিল গ্রহণে আপত্তি তুলতে পারেন। নিচের ছকটি প্রবাসীদের জমি কেনার ক্ষমতাপত্র তৈরিতে একটি চেকলিস্ট হিসেবে ব্যবহার করুন।
| ক্ষমতা | কেন দরকার | সতর্কতা |
|---|---|---|
| জমি দেখা, কাগজ যাচাই ও তল্লাশি | খতিয়ান, নামজারি ও বায়া দলিল তুলতে | জমির মৌজা, দাগ ও পরিমাণ নির্দিষ্ট করুন |
| বায়নাপত্র সম্পাদন | দাম ও শর্ত লিখিতভাবে চূড়ান্ত করতে | সর্বোচ্চ দাম বা অগ্রিমের সীমা লিখে দিন |
| মূল্য পরিশোধ | বিক্রেতাকে টাকা দিতে | টাকা সরাসরি বিক্রেতার ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর শর্ত দিন |
| দলিল উপস্থাপন ও গ্রহণ | সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ক্রেতার পক্ষে উপস্থিত থাকতে | দলিল অবশ্যই আপনার নামে হবে, প্রতিনিধির নামে নয় |
| নামজারি ও খাজনা | নামজারির আবেদন, শুনানি ও ভূমি উন্নয়ন কর | ভূমি অফিসে আবেদন আপনার নামে |
| দখল বুঝে নেওয়া | সীমানা নির্ধারণ ও দখল নিতে | বিক্রয় বা বন্ধকের ক্ষমতা দেবেন না |
কেনার ক্ষমতাপত্রে কখনো "বিক্রয়", "দান", "বন্ধক" বা "হস্তান্তর" করার ক্ষমতা যোগ করবেন না। শুধু কেনা ও আনুষঙ্গিক কাজের ক্ষমতা দিন, আর কাজ শেষে ক্ষমতাপত্রটি বাতিল করুন। এতে কেনা জমি পরে আপনার অজান্তে বিক্রি হওয়ার ঝুঁকি থাকে না।
বিদেশে দূতাবাসে সম্পাদন ও সত্যায়ন
প্রবাসীদের জমি কেনার প্রথম আনুষ্ঠানিক ধাপ হলো ক্ষমতাপত্র সম্পাদন। বিদেশে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদনের স্বীকৃত পথ হলো সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস, হাইকমিশন বা কনস্যুলেট। দাতাকে সশরীরে কনস্যুলার কর্মকর্তার সামনে স্বাক্ষর ও টিপসই দিতে হয়। প্রতিটি মিশনের নিজস্ব অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ফি ও কাগজের তালিকা আছে, তাই যাওয়ার আগে মিশনের ওয়েবসাইট দেখে নিন।
সাধারণত যে কাগজ লাগে
- সরকার নির্ধারিত ফরম অনুযায়ী বাংলা বা ইংরেজিতে প্রস্তুত ক্ষমতাপত্র, স্বাক্ষর না করা অবস্থায়।
- দাতা ও প্রতিনিধির সাম্প্রতিক রঙিন ছবি।
- দাতার বাংলাদেশি নাগরিকত্বের প্রমাণ: পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র বা যাচাইযোগ্য জন্মনিবন্ধন।
- প্রতিনিধির জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি।
- যে জমি কেনা হবে তার বিবরণ, সম্ভব হলে খতিয়ান বা দাগ নম্বরের অনুলিপি।
- বসবাসের দেশের পরিচয়পত্র এবং নাম পরিবর্তন হলে তার প্রমাণ।
কিছু মিশন বিক্রয়ের ক্ষমতাপত্রের ক্ষেত্রে দাতার মালিকানার কাগজ চায়; কেনার ক্ষমতাপত্রে জমির বিবরণ যতটা সম্ভব নির্দিষ্ট রাখলে প্রক্রিয়া সহজ হয়।
দেশে পৌঁছানোর পর: মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়
প্রবাসীদের জমি কেনার ক্ষেত্রে দূতাবাসের সত্যায়নই শেষ ধাপ নয়। ক্ষমতাপত্রটি বাংলাদেশে পাঠাতে হয় এবং প্রথমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার শাখায় প্রতিস্বাক্ষর করাতে হয়। এরপর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে (কালেক্টর হিসেবে) প্রযোজ্য স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধ করে প্রত্যয়ন করাতে হয়। এই প্রত্যয়ন ছাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ক্ষমতাপত্র ব্যবহার করা যায় না।
সময়সীমা মনে রাখুন
স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯-এর ধারা ১৮ অনুযায়ী বিদেশে সম্পাদিত দলিল বাংলাদেশে প্রথম পৌঁছানোর তিন মাসের মধ্যে স্ট্যাম্প করাতে হয়। ২০২৫ সালের সংশোধনী অনুযায়ী সত্যায়নের ছয় মাসের মধ্যে ক্ষমতাপত্রটি দেশে পাঠানোর কথাও বলা হয়েছে। কোনো কোনো মিশন মন্ত্রণালয়ের প্রতিস্বাক্ষরের জন্য আরও কম সময় উল্লেখ করে, যেমন লন্ডনের হাইকমিশন ৬০ দিনের কথা বলে। তাই সত্যায়নের পরপরই কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিন।
রাজউকের প্লট বা ফ্ল্যাট হলে
ঢাকায় রাজউকের প্লট বা ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের মার্চ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রদান বা বাতিলে রাজউকের অনুমোদন লাগে। প্রবাসীরা এখন দূতাবাসের মাধ্যমে কাগজ জমা দিয়ে সশরীরে উপস্থিত না হয়েই এই কাজ করতে পারেন। রাজউক এলাকায় ফ্ল্যাট কিনলে আমাদের বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার আইনি গাইড কাজে আসবে।
জমি যাচাই: প্রবাসীদের জমি কেনার আগে যে কাগজ দেখবেন
ক্ষমতাপত্র ঠিক থাকলেও জমির কাগজে সমস্যা থাকলে পুরো বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ে। দূরে থাকায় প্রবাসীরা প্রতারকদের সহজ লক্ষ্য, তাই প্রবাসীদের জমি কেনার ক্ষেত্রে যাচাইয়ে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। প্রতিনিধিকে বলুন প্রতিটি কাগজের ছবি বা স্ক্যান আপনাকে পাঠাতে, এবং একজন স্বাধীন আইনজীবী দিয়ে যাচাই করান।
- হালনাগাদ খতিয়ান: রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৫২ক অনুযায়ী বিক্রেতার নাম সর্বশেষ খতিয়ানে বা উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নামজারি খতিয়ানে থাকতে হবে, নইলে দলিল রেজিস্ট্রি হবে না।
- নামজারি ও ডিসিআর: বিক্রেতার নামে নামজারি হয়েছে কি না, ভূমি অফিস থেকে মিলিয়ে দেখুন।
- ভূমি উন্নয়ন কর: হালনাগাদ খাজনার দাখিলা আছে কি না।
- বায়া দলিল: অন্তত পঁচিশ বছরের মালিকানার ধারাবাহিকতা।
- তল্লাশি: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমিটি আগে বিক্রি, দান বা বন্ধক হয়েছে কি না।
- মামলা ও অধিগ্রহণ: জমি নিয়ে মামলা, খাস বা অর্পিত সম্পত্তি, বা সরকারি অধিগ্রহণের নোটিশ আছে কি না।
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি কিনলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখের প্রজ্ঞাপন মনে রাখুন: ওয়ারিশদের জমি সব ওয়ারিশের নামে একটি খতিয়ানে যৌথভাবে নামজারি হয়, আর আলাদা খতিয়ান হয় কেবল রেজিস্ট্রি করা বণ্টননামা বা আপসনামার মাধ্যমে। তাই সব শরিকের সম্মতি ও স্বাক্ষর ছাড়া কেনা জমি পরে বিরোধে জড়াতে পারে। দলিল যাচাই নিয়ে বিস্তারিত পাবেন আমাদের জমি রেজিস্ট্রেশন গাইডে।
সরেজমিন পরিদর্শন কেন জরুরি
কাগজ ঠিক থাকলেও বাস্তবে জমির অবস্থান, পরিমাণ বা দখল ভিন্ন হতে পারে। প্রতিনিধিকে বলুন জমির ভিডিও করে পাঠাতে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলতে এবং প্রয়োজনে সরকারি আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে মাপ মিলিয়ে নিতে। প্রবাসীদের জমি কেনা নিয়ে যত বিরোধ আদালতে আসে, তার বড় অংশ শুরু হয় কাগজের জমি আর মাঠের জমির অমিল থেকে। ভিডিও কলে সরাসরি জমি দেখে নেওয়াও এখন সহজ ও কার্যকর উপায়।

ধাপে ধাপে প্রবাসীদের জমি কেনা
নিচের ধাপগুলো বিদেশে থেকে প্রবাসীদের জমি কেনার সাধারণ ও নিরাপদ পথ। জেলা ও অফিসভেদে খুঁটিনাটি ভিন্ন হতে পারে, তাই প্রতিটি ধাপের আগে বর্তমান নিয়ম জেনে নিন।
- প্রতিনিধি বাছাই করুন। এমন কাউকে বেছে নিন যাঁকে আপনি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেন এবং যাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। সম্ভব হলে পরিবারের এমন সদস্য, যাঁর নিজের জমির লেনদেনে স্বার্থ নেই।
- ক্ষমতাপত্রের খসড়া তৈরি করুন। জমির বিবরণ, ক্ষমতার সীমা, দামের সীমা ও মেয়াদ নির্দিষ্ট করে আইনজীবী দিয়ে খসড়া করান।
- দূতাবাসে সম্পাদন করুন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সশরীরে স্বাক্ষর ও টিপসই দিন এবং সত্যায়িত মূল কপি সংগ্রহ করুন।
- দেশে প্রত্যয়ন করান। মূল কপি দ্রুত দেশে পাঠিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিস্বাক্ষর ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্ট্যাম্প শুল্ক দিয়ে প্রত্যয়ন করান।
- জমির কাগজ যাচাই করুন। খতিয়ান, নামজারি, খাজনা, বায়া দলিল ও তল্লাশি সম্পন্ন করুন এবং সরেজমিনে জমি দেখান।
- বায়নাপত্র ও অগ্রিম। দাম ও শর্ত লিখিত বায়নাপত্রে চূড়ান্ত করুন; অগ্রিম ব্যাংকের মাধ্যমে দিন।
- দলিল রেজিস্ট্রি করুন। বিক্রেতা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদন করবেন, আর প্রতিনিধি আপনার পক্ষে উপস্থিত থেকে প্রত্যয়িত ক্ষমতাপত্র দেখাবেন। দলিল হবে আপনার নামে।
- মূল্য পরিশোধ নিশ্চিত করুন। বাকি মূল্য ব্যাংক হিসাবে পাঠান এবং দলিলে পরিশোধের বিবরণ মিলিয়ে দেখুন।
- নামজারি ও দখল। রেজিস্ট্রির পর দ্রুত আপনার নামে নামজারির আবেদন করান, খাজনা দিন এবং সীমানা চিহ্নিত করে দখল বুঝে নিন।
এই নয়টি ধাপ ঠিকমতো মানলে প্রবাসীদের জমি কেনা দেশে বসে কেনার মতোই নিরাপদ হতে পারে। মূল কথা হলো, প্রতিটি ধাপের কাগজ আপনার হাতে বা ইমেইলে থাকা।
টাকা পাঠানো, কর ও খরচ
প্রবাসীদের জমি কেনায় ক্রেতাকে সাধারণত স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর এবং আনুষঙ্গিক খরচ বহন করতে হয়, আর বিক্রেতার উৎসে কর সাধারণত বিক্রেতার দায়। এই হারগুলো প্রায় প্রতি অর্থবছরে বদলায় এবং এলাকাভেদে ভিন্ন, তাই নির্দিষ্ট হিসাব সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা আইনজীবীর কাছ থেকে নিন। ক্ষমতাপত্রের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আলাদা স্ট্যাম্প শুল্ক দিতে হয়।
খরচের বাজেট কীভাবে করবেন
প্রবাসীদের জমি কেনার বাজেটে শুধু জমির দাম নয়, আরও কয়েকটি খাত রাখুন: দূতাবাসের ফি ও কুরিয়ার খরচ, ক্ষমতাপত্রের স্ট্যাম্প শুল্ক, জমির কাগজ তল্লাশি ও সার্টিফায়েড কপির খরচ, আইনজীবীর ফি, রেজিস্ট্রেশন খরচ, নামজারি ফি এবং সীমানা নির্ধারণ বা আমিনের খরচ। প্রতিনিধিকে আগেই একটি লিখিত খরচের তালিকা দিতে বলুন এবং প্রতিটি সরকারি ফির রসিদ চেয়ে নিন। সরকারি ফির রসিদ না থাকলে বুঝবেন কোথাও অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে।
আয়কর রিটার্ন ও জমির মূল্য
আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সীমার বেশি মূল্যের জমি রেজিস্ট্রিতে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণ (PSR) চাওয়া হতে পারে। প্রবাসী হলেও বাংলাদেশে করযোগ্য সম্পদ থাকলে কর নথিতে তা দেখানোর প্রশ্ন আসে। দলিলে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখানো আইনি ঝুঁকি তৈরি করে এবং ভবিষ্যতে বিক্রির সময় সমস্যা বাড়ায়।
নগদ টাকা প্রতিনিধির হাতে দেবেন না। প্রতিনিধির হিসাবে টাকা পাঠিয়ে তাঁকে দিয়ে বিক্রেতাকে নগদ দেওয়ানো সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি। সম্ভব হলে বিক্রেতার নিজের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি টাকা পাঠান এবং পে-অর্ডার বা ব্যাংক ট্রান্সফারের প্রমাণ রাখুন।
রেজিস্ট্রির পর: নামজারি, দখল ও খাজনা
প্রবাসীদের জমি কেনা দলিল রেজিস্ট্রি হলেই শেষ হয় না। জমির মালিকানা সরকারি রেকর্ডে আপনার নামে তুলতে নামজারি করাতে হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমিসেবা প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন করা যায়, এবং ক্ষমতাপত্রে নামজারির ক্ষমতা থাকলে প্রতিনিধি আপনার পক্ষে শুনানিতে অংশ নিতে পারেন। নামজারির সরকারি ফি আবেদনের সময় ৭০ টাকা এবং অনুমোদনের পর ১,১০০ টাকা, মোট ১,১৭০ টাকা।
নামজারির পর হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর দিন এবং দাখিলা সংরক্ষণ করুন। সরেজমিনে সীমানা নির্ধারণ করে দখল বুঝে নিন; প্রয়োজনে সীমানা প্রাচীর বা খুঁটি দিন। খালি জমি দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে দখলের ঝুঁকি বাড়ে, তাই নিয়মিত কাউকে দিয়ে দেখাশোনা করান।
দেশে ফিরে নিজে যা করবেন
প্রথম সুযোগে দেশে এলে নিজে একবার জমি দেখে আসুন, ভূমি অফিসে আপনার নামের খতিয়ান মিলিয়ে নিন এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের সার্টিফায়েড কপি তুলুন। প্রতিনিধির কাছে থাকা সব মূল কাগজ বুঝে নিন এবং কাজ শেষ হয়ে থাকলে ক্ষমতাপত্র বাতিল করুন। প্রবাসীদের জমি কেনার পর এই একবারের নিজস্ব যাচাই ভবিষ্যতের অনেক ঝামেলা দূর করে।
মূল দলিল কোথায় থাকবে
রেজিস্ট্রির পর মূল দলিল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পরে সরবরাহ করা হয়। প্রতিনিধি মূল দলিল তুলবেন, কিন্তু আপনি দ্রুত তার স্ক্যান কপি নিন এবং মূল দলিলটি আপনার নিজের নিরাপদ জিম্মায় বা ব্যাংকের লকারে রাখার ব্যবস্থা করুন।
ঝুঁকি ও প্রতারণা থেকে বাঁচার উপায়
দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রবাসীদের জমি কেনা নিয়ে প্রতারণার ঘটনা কম নয়। কেউ জমি কিনে নিজের নামে দলিল করিয়ে নেন, কেউ অতিরিক্ত দাম দেখিয়ে টাকা রেখে দেন, আবার কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে পরে জমি বিক্রি করে দেন। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ জাল দলিল ও প্রতারণামূলক হস্তান্তরকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে, তবে প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা।
- ক্ষমতাপত্রে কেনা ছাড়া অন্য কোনো হস্তান্তরের ক্ষমতা দেবেন না।
- নির্দিষ্ট মেয়াদ রাখুন, যেমন ছয় মাস বা এক বছর।
- প্রতিটি পরিশোধ ব্যাংকের মাধ্যমে করুন এবং রসিদের কপি নিন।
- রেজিস্ট্রির আগে দলিলের খসড়া নিজে পড়ুন বা আইনজীবী দিয়ে পড়ান।
- রেজিস্ট্রির পর সার্টিফায়েড কপি তুলে নিশ্চিত হোন যে ক্রেতা হিসেবে আপনার নামই আছে।
ক্ষমতাপত্র বাতিল করবেন যেভাবে
প্রবাসীদের জমি কেনা শেষ হলে বা প্রতিনিধির ওপর আস্থা হারালে ক্ষমতাপত্র বাতিল করুন। প্রত্যাহারযোগ্য ক্ষমতাপত্র আইনে নির্ধারিত নোটিশ দিয়ে বাতিল করা যায়; প্রতিনিধিকে এবং সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারকে লিখিতভাবে জানানো জরুরি, যাতে কেউ পুরোনো ক্ষমতাপত্র ব্যবহার করতে না পারে। বাতিলের পদ্ধতি দূতাবাসের মাধ্যমেও করা যায়।
প্রবাসীদের জমি কেনা নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
দেশে না এসে কি জমি কেনা সম্ভব?
হ্যাঁ। দূতাবাসে সম্পাদিত এবং দেশে প্রত্যয়িত পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে আপনার প্রতিনিধি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আপনার পক্ষে উপস্থিত হয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করাতে পারেন। দলিল হবে আপনার নামে।
নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিদেশে করা ক্ষমতাপত্র কি চলবে?
জমি সংক্রান্ত কাজে বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটে সম্পাদন ও সত্যায়নই নিরাপদ ও প্রচলিত পথ। অন্য পথে করা ক্ষমতাপত্র সাব-রেজিস্ট্রার গ্রহণ নাও করতে পারেন, তাই আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।
পাসপোর্ট না থাকলে কী করব?
২০২৫ সালের সংশোধনীর পর জাতীয় পরিচয়পত্র বা যাচাইযোগ্য জন্মনিবন্ধন দিয়েও দূতাবাসে ক্ষমতাপত্র করা যায়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের জন্য "নো ভিসা রিকোয়ার্ড" স্টিকারসহ বিদেশি পাসপোর্টও গ্রহণযোগ্য।
দেশে প্রত্যয়নের সময়সীমা কত?
স্ট্যাম্প আইনের ধারা ১৮ অনুযায়ী বিদেশে সম্পাদিত দলিল দেশে পৌঁছানোর তিন মাসের মধ্যে স্ট্যাম্প করাতে হয়, আর বিধিমালা অনুযায়ী সত্যায়নের ছয় মাসের মধ্যে দেশে পাঠাতে হয়। দেরি না করে সত্যায়নের পরপরই পাঠান।
প্রতিনিধি কি নিজের নামে জমি কিনে নিতে পারেন?
আইনত তিনি আপনার পক্ষে কাজ করছেন এবং দলিল আপনার নামেই হওয়ার কথা। নিজের নামে কিনে নেওয়া আস্থাভঙ্গ ও প্রতারণা, তবে মামলা করে প্রতিকার পাওয়া সময়সাপেক্ষ। তাই রেজিস্ট্রির আগে দলিলের খসড়া যাচাই করুন।
নামজারিও কি প্রতিনিধি করতে পারবেন?
হ্যাঁ, ক্ষমতাপত্রে নামজারির ক্ষমতা স্পষ্টভাবে লেখা থাকলে প্রতিনিধি আবেদন ও শুনানিতে অংশ নিতে পারেন। আবেদন হবে আপনার নামে।
আমরা যেভাবে সাহায্য করতে পারি
আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জমি ও ফ্ল্যাট কেনায় পরামর্শ দিই: ক্রয়ের ক্ষমতাপত্রের খসড়া, দূতাবাসের কাগজ প্রস্তুত, দেশে প্রত্যয়ন, জমির স্বাধীন যাচাই, দলিল রেজিস্ট্রি ও নামজারি পর্যন্ত। প্রবাসীদের জমি কেনা নিরাপদ করতে আমাদের রিয়েল এস্টেট প্র্যাকটিস সম্পর্কে জানুন।
বিদেশ থেকে দেশে জমি কিনতে চান?
আমরা আপনার ক্ষমতাপত্র তৈরি থেকে জমি যাচাই ও নামজারি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া দেখভাল করি, যাতে আপনার টাকা ও জমি দুটোই নিরাপদ থাকে।
পরামর্শ বুক করুনরিয়েল এস্টেট প্র্যাকটিসপ্রাথমিক উৎস: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২, রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮, স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯ ও ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ — বাংলাদেশ আইন পোর্টাল; প্রতিস্বাক্ষর সংক্রান্ত তথ্য — পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; খতিয়ান ও নামজারি সেবা — ভূমি মন্ত্রণালয়।
এই লেখাটি ২০২৬ সালের বাংলাদেশের আইন সম্পর্কে সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। আইন, ফি, দূতাবাসের নিয়ম ও প্রক্রিয়া পরিবর্তন হতে পারে; কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।



0 Comments