পরিবারের কেউ মারা গেলে জমির নামজারি, ব্যাংকের টাকা তোলা, পেনশন বা বীমার দাবি সব জায়গায় প্রথমে যে কাগজটি চাওয়া হয় তা হলো ওয়ারিশ সনদ। এটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া একটি প্রত্যয়নপত্র, যেখানে মৃত ব্যক্তির বৈধ উত্তরাধিকারীদের নাম ও সম্পর্ক উল্লেখ থাকে। সঠিকভাবে তৈরি সনদ পরবর্তী সব কাজ সহজ করে, আর ভুল সনদ বছরের পর বছর বিরোধ তৈরি করতে পারে।

- ওয়ারিশ সনদ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইস্যু করেন।
- আবেদনের আগে মৃত্যু নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করা প্রায় সব জায়গায় বাধ্যতামূলক।
- সকল উত্তরাধিকারীর নাম, যার মধ্যে স্ত্রী, কন্যা ও অন্যান্য অংশীদারও আছেন, সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে।
- জমির নামজারি ও ছোট অঙ্কের পাওনার জন্য এই সনদ যথেষ্ট হলেও বড় ব্যাংক হিসাব, শেয়ার বা সঞ্চয়পত্রের জন্য আদালতের সাকসেশন সার্টিফিকেট লাগতে পারে।
- ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিলে সনদ বাতিল হতে পারে এবং আইনগত দায় তৈরি হতে পারে।
ওয়ারিশ সনদ কী এবং কেন দরকার
ওয়ারিশ সনদ হলো এমন একটি প্রত্যয়নপত্র যেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নিশ্চিত করেন যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি মারা গেছেন এবং তাঁর উত্তরাধিকারী কারা। এটি কোনো আদালতের রায় নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ের যাচাইয়ের ভিত্তিতে দেওয়া একটি প্রশাসনিক দলিল। তবুও বাস্তবে ভূমি অফিস, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, বীমা কোম্পানি ও সরকারি দপ্তর উত্তরাধিকার প্রমাণের প্রথম ধাপ হিসেবে এটি চায়।
মুসলিম পরিবারে উত্তরাধিকার মুসলিম পারিবারিক আইন ও ফারায়েজ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, আর হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান পরিবারে তাদের নিজস্ব ব্যক্তিগত আইন প্রযোজ্য। ওয়ারিশ সনদ শুধু কারা উত্তরাধিকারী তা দেখায়, প্রত্যেকে কতটুকু অংশ পাবেন তা নির্ধারণ করে না। আমাদের চেম্বার সম্পর্কে জানতে পারেন, যেখানে উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়।
কোথা থেকে ওয়ারিশ সনদ নেবেন
| মৃত ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা | ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ |
|---|---|
| গ্রাম বা ইউনিয়ন এলাকা | সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান |
| পৌরসভা এলাকা | পৌরসভার মেয়র বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সিলর |
| সিটি কর্পোরেশন এলাকা | সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর, কোথাও কোথাও অনলাইনে |
| ক্যান্টনমেন্ট এলাকা | ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের নির্ধারিত কর্মকর্তা |
সাধারণত মৃত ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা যে এলাকায়, সেখান থেকেই ওয়ারিশ সনদ নিতে হয়। কেউ শহরে থাকলেও গ্রামের বাড়ির ঠিকানা স্থায়ী হলে অনেক সময় ইউনিয়ন পরিষদ থেকেই সনদ নেওয়া হয়। কিছু সিটি কর্পোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করে, তবে প্রক্রিয়া এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- মৃত ব্যক্তির মৃত্যু নিবন্ধন সনদ, যা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন ২০০৪ অনুযায়ী ইস্যু হয়।
- মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, থাকলে।
- সকল উত্তরাধিকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা নাবালকের ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ।
- আবেদনকারীর পাসপোর্ট আকারের ছবি।
- ওয়ার্ড সদস্য বা কাউন্সিলরের প্রত্যয়ন, যেখানে প্রযোজ্য।
- বিবাহ বা তালাকের প্রমাণ, যদি উত্তরাধিকারী নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক হয়।
- পূর্বে মৃত কোনো উত্তরাধিকারীর মৃত্যু সনদ, যাতে তাঁর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
মৃত্যু নিবন্ধন না থাকলে প্রথমে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন পোর্টালে নিবন্ধন করাতে হবে। বর্তমানে বেশিরভাগ কর্তৃপক্ষ মৃত্যু নিবন্ধন ছাড়া ওয়ারিশ সনদ দেয় না।
ধাপে ধাপে আবেদন প্রক্রিয়া
- মৃত্যু নিবন্ধন। মৃত্যুর পর যত দ্রুত সম্ভব মৃত্যু নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করুন।
- উত্তরাধিকারীর তালিকা। স্ত্রী বা স্বামী, পুত্র, কন্যা, পিতা, মাতা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য অংশীদারের পূর্ণ তালিকা তৈরি করুন।
- পরিচয়পত্র। প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদ সংগ্রহ করুন, নামের বানান মিলিয়ে নিন।
- প্রত্যয়ন। ওয়ার্ড সদস্য বা কাউন্সিলরের কাছ থেকে উত্তরাধিকারীদের বিষয়ে প্রত্যয়ন নিন।
- আবেদন। নির্ধারিত ফরমে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনে আবেদন জমা দিন।
- যাচাই ও ফি। কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে সরেজমিনে যাচাই করবে; নির্ধারিত ফি পরিশোধ করুন।
- সনদ গ্রহণ। সনদ হাতে পেয়ে প্রতিটি নাম, সম্পর্ক ও বানান মিলিয়ে দেখুন।
ওয়ারিশ সনদে কোনো কন্যা, স্ত্রী বা পূর্বে মৃত পুত্রের সন্তানদের নাম বাদ পড়লে পরে নামজারি ও বণ্টন নিয়ে মামলা হতে পারে। আবেদন জমার আগে পরিবারের সবাই মিলে তালিকাটি যাচাই করে নিন।
ওয়ারিশ সনদ বনাম সাকসেশন সার্টিফিকেট
| বিষয় | ওয়ারিশ সনদ | সাকসেশন সার্টিফিকেট |
|---|---|---|
| ইস্যুকারী | স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান | দেওয়ানি আদালত |
| আইনগত ভিত্তি | প্রশাসনিক প্রত্যয়ন | উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫, ধারা ৩৭২ |
| সময় | সাধারণত কয়েক দিন | কয়েক মাস |
| ব্যবহার | নামজারি, ছোট পাওনা, পেনশন | ব্যাংক আমানত, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ঋণ আদায় |
অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি টাকার জন্য আদালতের সাকসেশন সার্টিফিকেট চায়, কারণ এটি আইনগতভাবে তাদের সুরক্ষা দেয়। আদালতে আবেদন করার সময়ও ওয়ারিশ সনদ সহায়ক প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া হয়। বিস্তারিত জানতে আমাদের সাকসেশন সার্টিফিকেট গাইড দেখুন।
জমির নামজারিতে ওয়ারিশ সনদের ব্যবহার
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমির খতিয়ান নিজের নামে করতে হলে উপজেলা বা সার্কেল ভূমি অফিসে নামজারির আবেদন করতে হয়। এ সময় ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদ, পূর্ববর্তী খতিয়ান, দলিল ও খাজনার রসিদ জমা দিতে হয়। বর্তমানে নামজারির আবেদন অনলাইনে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সেবার মাধ্যমে করা যায়।
উত্তরাধিকারীরা চাইলে সবার নামে যৌথভাবে নামজারি করতে পারেন, অথবা আগে বণ্টননামা করে প্রত্যেকের অংশ আলাদা করতে পারেন। ভূমি নিবন্ধন সম্পর্কে আরও জানতে আমাদের জমি রেজিস্ট্রেশন গাইড পড়ুন।
ব্যাংক, পেনশন ও বীমায় ব্যবহার
মৃত ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে নমিনি থাকলে নমিনি সাধারণত সহজে টাকা তুলতে পারেন, তবে নমিনি অনেক ক্ষেত্রে শুধু জিম্মাদার হিসেবে টাকা গ্রহণ করেন এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের দায় থেকে যায়। নমিনি না থাকলে ব্যাংক ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদ, উত্তরাধিকারীদের পরিচয়পত্র এবং প্রায়ই ইনডেমনিটি বন্ড চায়।
সরকারি কর্মচারীর পেনশন ও আনুতোষিকের ক্ষেত্রে পারিবারিক পেনশনের জন্য ওয়ারিশ সনদ ও অন্যান্য প্রমাণ জমা দিতে হয়। বীমা দাবির ক্ষেত্রেও নমিনি না থাকলে বীমা কোম্পানি একই ধরনের কাগজ চায়।
ভুল সংশোধন ও বাতিল
ওয়ারিশ সনদে কোনো উত্তরাধিকারীর নাম বাদ পড়লে, ভুল নাম বা সম্পর্ক লেখা হলে, বা কোনো অ-উত্তরাধিকারীর নাম যুক্ত হলে ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে সংশোধনের আবেদন করা যায়। প্রয়োজনে প্রমাণসহ শুনানি হতে পারে।
জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সনদ নেওয়া প্রতারণা ও জালিয়াতির শামিল হতে পারে এবং দণ্ডবিধির আওতায় মামলা হতে পারে। কর্তৃপক্ষ সংশোধন না করলে বা বিরোধ জটিল হলে দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক মামলা বা বণ্টন মামলার আশ্রয় নিতে হতে পারে।
প্রবাসী উত্তরাধিকারীদের জন্য করণীয়
অনেক পরিবারে এক বা একাধিক উত্তরাধিকারী বিদেশে থাকেন। ওয়ারিশ সনদে তাঁদের নামও অবশ্যই থাকতে হবে। তাঁরা দেশে না এসেও নামজারি বা বণ্টনের কাজ করাতে চাইলে বিদেশে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করে বাংলাদেশ মিশনে সত্যায়ন বা অ্যাপোস্টিল করিয়ে দেশে পাঠাতে পারেন।
দেশে আসার পর ওই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্ট্যাম্প ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। বিস্তারিত জানতে আমাদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি গাইড দেখুন।
ফি ও সময়
ওয়ারিশ সনদের ফি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন হয় এবং সাধারণত সামান্য। কাগজপত্র সম্পূর্ণ থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই সনদ পাওয়া যায়, তবে সরেজমিন যাচাই বা আপত্তি থাকলে বেশি সময় লাগতে পারে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগীকে অতিরিক্ত টাকা না দিয়ে সরাসরি পরিষদ বা ওয়ার্ড কার্যালয়ে যোগাযোগ করাই ভালো।
সাধারণ ভুল যা এড়িয়ে চলবেন
- কন্যা সন্তান বা স্ত্রীর নাম বাদ দেওয়া, যা মুসলিম আইনে স্পষ্টভাবে ভুল।
- পূর্বে মৃত সন্তানের সন্তানদের বিষয়ে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ৪ বিবেচনা না করা।
- জাতীয় পরিচয়পত্র ও সনদে নামের বানানে অমিল রাখা।
- একাধিক বিয়ে থাকলে সকল স্ত্রী ও সন্তানের তথ্য না দেওয়া।
- মৃত্যু নিবন্ধন ছাড়া সনদ নেওয়ার চেষ্টা করা।
এসব ভুল এড়ালে ওয়ারিশ সনদ পরবর্তী সব কাজে নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে কাজ করবে। মুসলিম পারিবারিক আইন সম্পর্কে আরও জানতে আমাদের মুসলিম পারিবারিক আইন গাইড পড়ুন।
মুসলিম উত্তরাধিকারে কে কতটুকু পান
মুসলিম আইনে উত্তরাধিকারীদের প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়: নির্ধারিত অংশের অধিকারী, অবশিষ্টাংশভোগী এবং দূরবর্তী আত্মীয়। নির্ধারিত অংশের অধিকারীদের মধ্যে আছেন স্বামী বা স্ত্রী, পিতা, মাতা, কন্যা, পুত্রের কন্যা, দাদা, দাদি ও কিছু ক্ষেত্রে ভাইবোন। তাঁদের অংশ পবিত্র কোরআনে নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে।
উদাহরণস্বরূপ, সন্তান থাকলে স্ত্রী পান আট ভাগের এক ভাগ, সন্তান না থাকলে চার ভাগের এক ভাগ। স্বামী সন্তান থাকলে স্ত্রীর সম্পত্তির চার ভাগের এক ভাগ এবং সন্তান না থাকলে অর্ধেক পান। পুত্র ও কন্যা একসাথে থাকলে পুত্র কন্যার দ্বিগুণ পান। পিতা ও মাতা সন্তান থাকলে প্রত্যেকে ছয় ভাগের এক ভাগ পান।
এই হিসাব অনেক সময় জটিল হয়ে যায়, বিশেষ করে যখন একাধিক স্ত্রী, পূর্বে মৃত সন্তান বা শুধু কন্যা সন্তান থাকে। তাই বণ্টনের আগে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী বা ফারায়েজ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে হিসাব যাচাই করে নেওয়া উচিত।
হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার
বাংলাদেশে হিন্দু পরিবারে সাধারণত দায়ভাগ মতবাদ অনুসরণ করা হয়। এ মতবাদে পিতার মৃত্যুর পর পুত্ররা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন, আর বিধবা স্ত্রী জীবনস্বত্বে সম্পত্তি ভোগ করেন। কন্যাদের অধিকার কিছু নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে স্বীকৃত।
খ্রিস্টান পরিবারের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫ প্রযোজ্য, যেখানে বিধবা ও সন্তানদের মধ্যে নির্দিষ্ট অনুপাতে সম্পত্তি বণ্টিত হয়। বৌদ্ধ পরিবারে সাধারণত হিন্দু আইনের অনুরূপ নিয়ম অনুসরণ করা হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সনদে উত্তরাধিকারীদের নাম সঠিক থাকা জরুরি, কারণ পরবর্তী বণ্টন সেই তালিকার ওপর নির্ভর করে।
বণ্টননামা কেন জরুরি
উত্তরাধিকারীরা যৌথভাবে সম্পত্তির মালিক হলেও যতদিন বণ্টন না হয়, ততদিন কেউ নির্দিষ্ট অংশ এককভাবে বিক্রি বা উন্নয়ন করতে গেলে সমস্যা হয়। এজন্য সব উত্তরাধিকারীর সম্মতিতে রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা দলিল করা সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
বণ্টননামায় প্রত্যেকের অংশ দাগ ও পরিমাণসহ উল্লেখ থাকে, এবং পরে প্রত্যেকে আলাদাভাবে নামজারি করতে পারেন। সম্মতি না হলে দেওয়ানি আদালতে বণ্টনের মামলা করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। পরিবারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে আপসে বণ্টন করলে খরচ ও সময় দুটোই বাঁচে।
নমিনি ও উত্তরাধিকারীর পার্থক্য
অনেকের ধারণা, ব্যাংক হিসাব বা সঞ্চয়পত্রে যাঁকে নমিনি করা হয়েছে, তিনিই পুরো টাকার মালিক। আইনগতভাবে বিষয়টি এত সরল নয়। নমিনি সাধারণত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা গ্রহণের অধিকারী, কিন্তু টাকার প্রকৃত মালিকানা ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সকল উত্তরাধিকারীর।
অর্থাৎ নমিনি টাকা তোলার পর অন্য উত্তরাধিকারীরা তাঁর কাছে নিজেদের অংশ দাবি করতে পারেন। এই বিষয়টি বিভিন্ন আইন ও আদালতের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে, তাই বড় অঙ্কের ক্ষেত্রে আইনি পরামর্শ নেওয়া উচিত।

নারীর উত্তরাধিকার অধিকার রক্ষা
বাস্তবে অনেক পরিবারে কন্যা, বোন বা বিধবা স্ত্রীকে তাঁর প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করার প্রবণতা দেখা যায়। কখনো সামাজিক চাপে তাঁরা অংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, কখনো তাঁদের না জানিয়েই নামজারি করা হয়।
নারী উত্তরাধিকারীর নাম সনদে না থাকলে তিনি সংশোধনের আবেদন করতে পারেন, নামজারির বিরুদ্ধে আপত্তি দিতে পারেন এবং প্রয়োজনে বণ্টন মামলা করতে পারেন। কেউ স্বেচ্ছায় অংশ ছেড়ে দিতে চাইলে তা রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে হওয়া উচিত, মৌখিকভাবে নয়।
একটি বাস্তব উদাহরণ
ধরা যাক, রহিম সাহেব মারা গেছেন। তাঁর স্ত্রী, দুই পুত্র ও এক কন্যা জীবিত। তাঁর এক পুত্র তাঁর আগেই মারা গেছেন এবং সেই পুত্রের দুই সন্তান আছে। পরিবার যদি শুধু জীবিত স্ত্রী ও তিন সন্তানের নাম দিয়ে আবেদন করে, তাহলে পূর্বে মৃত পুত্রের সন্তানদের অধিকার উপেক্ষিত হবে।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ৪ অনুযায়ী পূর্বে মৃত পুত্রের সন্তানরা তাঁদের পিতা জীবিত থাকলে যে অংশ পেতেন, সেই অংশ পাবেন। তাই সঠিক তালিকায় তাঁদের নামও থাকা উচিত। এই ভুল পরে ধরা পড়লে নামজারি বাতিল ও নতুন করে বণ্টনের প্রয়োজন হতে পারে।
আবেদনের আগে একটি চেকলিস্ট
- মৃত্যু নিবন্ধন সনদ হাতে আছে কি না।
- সকল উত্তরাধিকারীর পূর্ণ নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা লেখা হয়েছে কি না।
- নাবালক উত্তরাধিকারীর জন্ম নিবন্ধন সংগ্রহ করা হয়েছে কি না।
- পূর্বে মৃত উত্তরাধিকারীর সন্তানদের তথ্য আছে কি না।
- পরিবারের সবাই তালিকা দেখে একমত হয়েছেন কি না।
- প্রবাসী সদস্যদের পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের কপি আছে কি না।
এই চেকলিস্ট মেনে চললে আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং পরবর্তী জটিলতা অনেক কমে যায়।
বণ্টনের আগে যা পরিশোধ করতে হয়
মুসলিম আইনে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করার আগে কয়েকটি দায় মেটাতে হয়। প্রথমে দাফন-কাফনের যুক্তিসঙ্গত খরচ, তারপর মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করতে হয়। স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহরও একটি ঋণ হিসেবে গণ্য হয় এবং অগ্রাধিকার পায়।
এরপর মৃত ব্যক্তি কোনো অসিয়ত করে গেলে অবশিষ্ট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত তা কার্যকর করা যায়, তবে উত্তরাধিকারীর পক্ষে অসিয়ত অন্য উত্তরাধিকারীদের সম্মতি ছাড়া কার্যকর হয় না। এসব মেটানোর পর যা থাকে, তা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে নির্ধারিত অংশে বণ্টিত হয়।
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি ও আয়কর
বাংলাদেশে বর্তমানে আলাদা কোনো উত্তরাধিকার কর নেই। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক আমানত বা শেয়ার আয়কর রিটার্নের সম্পদ বিবরণীতে দেখাতে হয়, যদি উত্তরাধিকারী করদাতা হন। এসব সম্পদ থেকে পরবর্তীতে ভাড়া, মুনাফা বা বিক্রয়লব্ধ আয় হলে তার ওপর প্রযোজ্য কর দিতে হয়।
উত্তরাধিকারী সম্পত্তি বিক্রি করলে রেজিস্ট্রেশনের সময় উৎসে কর ও অন্যান্য ফি প্রযোজ্য হয়। রিটার্নে সম্পদের উৎস হিসেবে উত্তরাধিকার উল্লেখ করার সময় সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সংরক্ষণে রাখা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কর কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন করলে প্রমাণ দেখানো যায়।
যৌথ মালিকানার সম্পত্তি বিক্রি ও অগ্রক্রয়
বণ্টন না হওয়া সম্পত্তির কোনো অংশীদার নিজের অংশ বাইরের কারো কাছে বিক্রি করলে অন্য অংশীদাররা আইনের নির্ধারিত শর্তে অগ্রক্রয়ের দাবি করতে পারেন। কৃষি জমির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন এবং অকৃষি জমির ক্ষেত্রে অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী এই অধিকার প্রয়োগ হয়।
অগ্রক্রয়ের মামলা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে করতে হয়, তাই বিক্রির খবর জানার সঙ্গে সঙ্গে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিরোধ এড়াতে সবচেয়ে ভালো হলো আগে বণ্টননামা সম্পন্ন করে তারপর নিজের অংশ বিক্রি করা।
অনলাইনে আবেদনের কিছু টিপস
যেসব এলাকায় অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়, সেখানে সব কাগজ স্পষ্টভাবে স্ক্যান করে আপলোড করুন। ছবির আকার ও ফাইলের ধরন নির্দেশনা অনুযায়ী রাখুন। আবেদনের পর দেওয়া ট্র্যাকিং নম্বর সংরক্ষণ করুন এবং মোবাইলে আসা বার্তা খেয়াল রাখুন।
অনলাইনে আবেদন করলেও অনেক সময় যাচাইয়ের জন্য কার্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত হতে বা স্থানীয় প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করতে হতে পারে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তারা এ বিষয়ে সাহায্য করতে পারেন, তবে নির্ধারিত সেবামূল্যের বেশি অর্থ দাবি করলে কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন।
বিরোধ দেখা দিলে কী করবেন
উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কে বৈধ উত্তরাধিকারী, কোনো বিয়ে বৈধ কি না, বা কোনো সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সাধারণত বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক মামলা বা পারিবারিক আদালতে প্রাসঙ্গিক মামলা করতে হয়।
আদালতের রায় পাওয়ার পর সেই রায়ের ভিত্তিতে সংশোধিত সনদ নেওয়া বা সরাসরি আদালতের আদেশ দিয়ে নামজারি করা যায়। বিরোধের শুরুতেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে আপস করার চেষ্টা করা অনেক সময় সবচেয়ে কার্যকর ও কম খরচের পথ।
নাবালক উত্তরাধিকারীর স্বার্থ রক্ষা
উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কেউ নাবালক হলে তাঁর অংশ বিক্রি, হস্তান্তর বা বণ্টনে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। নাবালকের সম্পত্তি তাঁর অভিভাবক নিজের ইচ্ছামতো বিক্রি করতে পারেন না। অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০ অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি নিতে হয়, এবং অনুমতি ছাড়া করা হস্তান্তর পরে বাতিলযোগ্য হতে পারে।
নাবালকের নামে প্রাপ্ত টাকা সাধারণত তাঁর কল্যাণে ব্যবহার বা নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হয়। মা অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের দেখাশোনা করলেও সম্পত্তির আইনগত অভিভাবকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তাই প্রয়োজনে পারিবারিক আদালত বা জেলা জজ আদালত থেকে অভিভাবকত্বের আদেশ নেওয়া উচিত। নাবালক প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজের অংশ বুঝে নিতে এবং প্রয়োজনে পূর্ববর্তী হস্তান্তর চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।
পরিবারের বড়রা সচেতন থাকলে নাবালকের অধিকার যেমন সুরক্ষিত থাকে, তেমনি ভবিষ্যতে পারিবারিক বিরোধের আশঙ্কাও কমে।
ওয়ারিশ সনদ নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা
ওয়ারিশ সনদ কে দেন?
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর।
মৃত্যু নিবন্ধন ছাড়া কি সনদ পাওয়া যায়?
বর্তমানে বেশিরভাগ কর্তৃপক্ষ মৃত্যু নিবন্ধন সনদ ছাড়া ওয়ারিশ সনদ দেয় না।
ওয়ারিশ সনদ দিয়ে কি ব্যাংকের টাকা তোলা যায়?
ছোট অঙ্কের ক্ষেত্রে অনেক ব্যাংক গ্রহণ করে, তবে বড় অঙ্কে সাকসেশন সার্টিফিকেট লাগতে পারে।
সনদে ভুল হলে কী করব?
ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণসহ সংশোধনের আবেদন করুন; প্রয়োজনে আদালতে যান।
সনদে কি প্রত্যেকের অংশ লেখা থাকে?
না, শুধু উত্তরাধিকারীদের নাম ও সম্পর্ক থাকে; অংশ নির্ধারিত হয় ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী।
প্রবাসী উত্তরাধিকারী কীভাবে অংশ নেবেন?
পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে দেশে প্রতিনিধি নিয়োগ করে।
আমরা কীভাবে সহায়তা করতে পারি
আমরা ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ, ভুল সংশোধন, নামজারি, বণ্টননামা, সাকসেশন সার্টিফিকেট এবং প্রবাসী উত্তরাধিকারীদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আইনি সহায়তা দিই। আমাদের চেম্বার সম্পর্কে জানুন অথবা সরাসরি যোগাযোগ করুন।
উত্তরাধিকার নিয়ে জটিলতায় আছেন?
আমরা কাগজপত্র যাচাই করে সঠিক পথ দেখাই।
পরামর্শ নিনআমাদের সম্পর্কেপ্রাথমিক সূত্র: উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন ২০০৪, বাংলাদেশের আইন পোর্টালে।
এই নিবন্ধটি অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের আইনের সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। স্থানীয় প্রক্রিয়া ও ফি এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে।



0 Comments